কাজে আসছে না লেন ব্যবস্থা কমছে না যানজট

  • by

কাজে আসছে না লেন ব্যবস্থা কমছে না যানজট

মীর রাকিব উন নবী

রাজধানীর যানজট নিরসনে ট্যাক্সি, সিএনজি, প্রাইভেট কার, মাইক্রোবাস এবং বাস ট্রাক চলাচলের জন্য রাস্তায় আলাদা লেন চিহ্নিত করে দেওয়া হলেও তাতে কোনও কাজ হচ্ছে না। অধিকাংশ চালক এসব লেন নির্দেশক চিহ্ন মানছেন না। যারা লেন মেনে যানবাহন চালাতে চাচ্ছেন তারাও অমান্যকারীদের কারণে মানতে পারছেন না। আর ট্রাফ্রিক পুলিশ লেন মানা হচ্ছে কি হচ্ছে না সে ব্যাপারে নির্বিকার ভুমিকা পালন করছে। স্বভাবতই কমছে না শহরের যানজট।

১৪ জানুয়ারী বৃহস্পতিবার বিকাল ৪ টায় রাজধানীর বাংলামোটর মোড়ে গিয়ে দেখা গেছে এখানে যানবাহনভেদে লেন ভাগ করে দেওয়া থাকলেও তা মানছে না কেউই। ঠিক ট্রাফিক বক্সের সামনেই এ লেন বিভাজন, কিন্তু তারপরও অমান্যকারী চালকদের যেন দেখেও দেখছেন না সার্জেন্টসহ অন্য ট্রাফিক সদস্যরা।

এ ব্যাপারে কর্তব্যরত সার্জেন্টদের দৃষ্টি আর্কষন করা হলে তিনি বলেন, বিকালে যানবাহনের চাপ এত বেশি থাকে যে লেন মানা হচ্ছে কি হচ্ছে না ধরতে গেলে এ রাস্তা দিয়ে গাড়িই চলতে পারবে না। রাজধানীর মিন্টো রোড ও ইস্কাটন এলাকা, নিউমার্কেট, সায়েন্স, ল্যাবরেটরি, ফার্মগেট ও মহাখালীতেও একই চিত্র দেখা গেছে। রাস্তায় যে লেন দিয়ে শুধু প্রাইভেট কার ও মাইক্রোবাস যাওয়ার কথা, সেদিক দিয়ে চলছে কার সি এনজি বাস ট্যাক্সিক্যাব সবকিছুই। পাশেই কর্তব্য পালন করছেন ট্রাফিক পুলিশ, কিন্তু লেন মানা না মানায় তাদের যেন কিছুই যায় আসে না।

বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে আলাপ করে জানা গেছে, মুলত যানজটের প্রধান কারণকে পাশ কাটিয়ে অন্য ছোট খাটো সমস্যা সমাধানের চেষ্টা করলে লাভ তো হবেই না, বরং এ রকম উল্টো ফল আসবে। এ ব্যাপারে পরিবেশ বাচাও অন্দোলনের (পবা) চেয়ারম্যান আবু নাসের খান বলেন,  রাজধানীর যানজটের প্রধান কারণ হচ্ছে প্রাইভেট কার। এখানে প্রাইভেট কার চলার উপযোগী করে রাস্তা তৈরি করা হচ্ছে,  বছর বছর প্রাইভেট কার বাড়ছে আশঙ্কাজনকহারে। কিন্তু সাধারণ মানুষের সহজে যাতায়াতের কোনও ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে না। শহরের দেড় কোটি সাধারণ মানুষের যাতায়াতের সুষ্ঠু বন্দোবস্ত আগে করতে হবে,  না হলে যানজট কমবে না। তিনি বলেন, হাটার উপযোগী সুন্দর ফুটপাথ এবং সহজে সুলভে সর্বত্র যাওয়া যায় এমন পাবলিক বাস ব্যবস্থা চালু করা হলে যানজট কমবে। লেন ব্যবস্থা চালু কিংবা সিগন্যাল বাতি মেনে চলার আদেশও তখন বুমেরাং হবে না।

দিন দিন যানজট বেড়ে যাওয়া এবং কোনও পরিকল্পনা কাজে না আসার ব্যাপারে সরকারি কর্তৃপক্ষও উদ্বিগ্ন। এ বিষয়ে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের ডেপুটি কমিশনার (ট্রাফিক) শফিকুর রহমানের সঙ্গে কথা বলা হলে তিনি শুধু বলেন, আমরা সমস্যা সমাধানের সর্বোচ্চ চেষ্টা চালাচ্ছি। আশা করি দ্রুতই রাজধানীর যানজট পরিস্থিতির উন্নতি ঘটবে।

দৃশ্যপট-১, শাহবাগ – যাত্রাবাড়ী

১৪ জানুয়ারী বিকালে রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় ঘুরে ভয়াবহ যানজটের বিভিন্ন চিত্র দেখা গেছে। অথচ সাম্প্রতিক সময়ে লেন ব্যবস্থা প্রবর্তন, সিগন্যাল বাতি মেনে চলার আদেশ জারিকরণসহ বিভিন্ন পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে সরকারের পক্ষ থেকে। অধিকাংশ জায়গায় এসব সরকারি আদেশ নির্দেশ মানাই হচ্ছে না। ৪ টা ২০ মিনিট শাহবাগ মোড়ে গিয়ে দেখা গেছে সিগন্যাল বাতি নির্দেশ করছে যানবাহন থামতে,  অথচ সার্জেন্ট হাত নাড়িয়ে নির্দেশ দিচ্ছেন চলতে। মোড় থেকে গাড়ির সারি একদিকে শেরাটন হোটেল, একদিকে কাটাবন মোড়, এবং এক দিকে রমনা ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউট মিলনায়তন পর্যন্ত পৌছে গেছে। এবং গাড়ি এগোচ্ছে শম্বুক গতিতে। এদিন শাহবাগ থেকে জাতীয় প্রেসক্লাব পর্যন্ত প্রায় তিন কিলোমিটার দুরুত্ব পার হতে সময় লেগেছে ৫০ মিনিট। ৫ টা ১০ মিনিটে প্রেস ক্লাবে এসে দেখা গেছে রাস্তার দুই পাশেই গাড়ির লম্বা সারি। একদিকে গাড়ির সারি গিয়ে ঠেকেছে পল্টন মোড় পর্যন্ত। এখানেও রাস্তার চারদিকে চারটি বড় বড় স্থবির যানের সারি।

এরপর গুলিস্তান বঙ্গভবন হয়ে ইত্তেফাকের মোড় পর্যন্ত রাস্তায় ঘুরে দেখা গেছে,  পুরা রাজধানীই আসলে যানজটের খপ্পরে পড়ে আছে। টিকাটুরি ওভার ব্রিজের নিচে গাড়ির লম্বা বাক নেওয়া লাইন ইত্তেফাক ভবনের সামনে দিয়ে এসে রাজধানী সুপার মার্কেট পার হয়ে যেতে দেখা গেছে। রাজধানী সুপার মার্কেট ও স্বামীবাগ পার হয়ে আবার যানজট শুরু। এবারে সায়েদাবাদ বাস টার্মিনাল থেকে জনপথ মোড় পর্যন্ত নিরেট যানবাহনের লাইন। এর মধ্যে একটি সুতোও ঢোকানোর উপায় নেই। আর যানবাহনের মধ্যে বাস রিকশা সিএনজি ট্রাক ট্যাক্সি সবই আছে।

জনপথ মোড় থেকে একটু এগিয়ে দেখা গেল সায়েদাবাদ ভাঙা ব্রিজ থেকে আবার যানজট। এবারে একেবারে যাত্রাবাড়ী ওভার বিজ্র পর্যন্ত। যাত্রাবাড়ী মোড়ে দায়িত্ব পালনরত সার্জেন্টকে যানজটের কারণ জিজ্ঞাসা করা হলে তিনি বলেন,  মূলত বৃহস্পতিবার বিকালে অনেক মানুষ রাজধানী ছেড়ে নিজ নিজ স্থায়ী ঠিকানার উদ্দেশ্যে ছোটেন বলে এই দিন যানজটটা থাকে সবচেয়ে বেশি। যে কারণে ১০ মিনিটের রাস্তা পার হতে এক থেকে দুই ঘন্টা লাগে এবং এটা নগরবাসীর জন্য খুব স্বাভাবিক হয়ে গেছে বলে মন্তব্য করেন তিনি।

দৃশ্যপট-২, মৌচাক- মিরপুর ১০ নং গোলচত্বর

১৭ জানুয়ারী রবিবার সকাল ৯ টায় রাজধানীর মৌচাক মোড়ে গিয়ে দেখা গেছে এখান থেকে যেদিকে চোখ যায় সেদিকেই ছোট বড় যানবাহনের লাইন।  একদিকের লাইন মালিবাগ মোড় ছাড়িয়ে রাজারবাগ পুলিশ লাইন স্কুল পার হয়ে গেছে,  রামপুরার দিকে যাওয়ার রাস্তাটি যতদুর দেখা যাচ্ছিল শুধু স্থবির যানবাহনের চাকা আর ভোগান্তিতে অস্থির মানুষের চেহারা আর কিছুই নেই। মগবাজার মোড়ের দিকে এগোতে গিয়ে প্রথমে ওয়্যারলেস গেট পর্য্নত কিছুটা রাস্তা ফাকা পাওয়া গেল। কিন্তু এরপর থেকে শুরু যানবাহনের লম্বা লাইন। এ লাইন একেবারে মগবাজার মোড় পর্যন্ত। এখানে মিন্টো রোড থেকে তেজগাওমুখী সোজা রাস্তাটি ভি আই পি সড়ক হওয়ায় অপর দিকের মৌচাক থেকে বাংলামোটর মুখী রাস্তাটি দিয়ে চলাচলকারি মানুষ রয়েছেন চরম ভোগান্তির মুখে। কয়েকজন বাস যাত্রীর সঙ্গে আলাপ করে জানা গেল, ভিআইপি রোডে একবার গাড়ি ছাড়লে সেটা পাঁচ মিনিট থেকে দশ মিনিট পর্যন্ত চলে। পুরো রাস্তা ফাকা না হওয়া পর্যন্ত ট্রাফিক আটকায় না। অথচ অন্য রাস্তাটিতে একবারে দুই থেকে তিন মিনিটের বেশি গাড়ি ছাড়া হয় না। এ মোড়ে রিকশা চলাচল নিষিদ্ধ থাকলেও সেটি সবসময় মানা হয় না। একই জায়গা দিয়ে অল্প গতির এবং দ্রুতগতির যানবাহন একসঙ্গে চলাচল করলে স্বাভাবিকভাবেই দ্রুতগতির যানটির গতি কমে যায়। ফলে দুই তিন মিনিটের সিগন্যাল রিকশা গাড়ি বাস সবমিলিয়ে মাত্র দশ বারোটা যানবাহন পার হওয়ার সুযোগ পায়। যে কারণে এই রাস্তা দিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে এক যাত্রীকে নুন্যতম এক ঘন্টা অপেক্ষা করতে হয়। বাস যাত্রীরা আরও বলেন, দিনের যেকোনও সময় এখান দিয়ে যেতে হলে জ্যামে পড়তে হবেই,  এটা নিয়ম হয়ে গেছে।

মগবাজার পার হয়ে বাংলামোটর মোড়ে গিয়ে আবারও যানজট। এ মোড় পার হয়ে একটু সামনে গিয়ে আবারও যানজট। কাওরানবাজার সার্ক ফোয়ারা থেকে শুরু হওয়া গাড়ির সারি শেষ হয়েছে হাতিরপুল কাচাবাজারের সামনে গিয়ে। এর মধ্যে বাংলামোটর দিয়ে এ রাস্তায় ঢোকা যানবাহনগুলোও গিয়ে মিশছে সেই সারিতে। মিশে যানজট আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে। এই রাস্তা দিয়ে যানবাহনগুলো এগুচ্ছে খুবই আস্তে আস্তে। বাংলামোটর থেকে কারওয়ানবাজার মোড় পর্যন্ত যেতেই সময় লাগছে পাকা আধ ঘন্টা। অথচ দুরুত্ব এক কিলোমিটারও হবে কিনা সন্দেহ!

এরপরে কিছুদূর রাস্তা ফাকা পাওয়া গেলেও আবার যানজটের দেখা মিলেছে ফার্মগেটের প্রতম ওভার ব্রিজ থেকে। ফার্মগেট মোড়ে একদিকে বাস ও প্রাইভেট কার  সাব লেনে ঢুকছে,  আবার আরেক সাবলেন দিয়ে গাড়ি মূল রাস্তায় বের হচ্ছে,  এর মধ্যে মূল রাস্তায় গাড়ি চলছে সবমিলিয়ে এক জগাখিচুড়ি অবস্থা। ফার্মগেট মোড় থেকে যানবাহনের লম্বা সার গিয়ে পৌছেছে বিজয় সারনি মোড় পর্যন্ত। এর সামনেও রয়েছে যানবাহনের দীর্ঘ সারি। বিজয় সারনি থেকে বামদিকে বঙ্গবন্ধু নভোথিয়েটার সংলগ্ন রাস্তাটি কিছুটা ফাকা থাকলেও এখানে কিছুক্ষণ পর পর যানজট সৃষ্টি হতে দেখা গেছে।

 

বছর বছর প্রাইভেট কার বাড়ছে আশঙ্কাজনক হারে। কিন্তু সাধারণ মানুষের সহজে যাতায়াতের কোনও ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে না। শহরের প্রায় দেড় কোটি সাধারণ মানুষের যাতায়াতের সুষ্ঠু বন্দোবস্ত আগে করতে হবে,  না হলে যানজট কমবে না।

আগারগায়ের বিসিএস কম্পিউটার সিটি পার হওয়ার পর স্থবির যানবাহনের সারি দেখা গেছে একবারে তালতলা পর্যন্ত। এরপরে শেওড়াপাড়া বাস স্টপেজের আগে আবার যানজট। কাজীপাড়া বাস স্টপেজ পার হতেই আবার যানজট,  সেনপাড়া থেকে একেবারে মিরপুর ১০ নং গোল চত্বর পর্যন্ত। এ রাস্তায় নিয়মিত এ রকম ভয়াবহ যানজটের ফলে মানুষের ভোগান্তিও দিনে দিনে বাড়ছে। স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে,  প্রতিদিন সকাল ৮ টা থেকে দুপুর ১ টা পর্যন্ত এবং বিকাল ৪ টা থেকে রাত ৮ টা পর্যন্ত এ রাস্তায় যানজট থাকবেই। এবং এ সময়ে মিরপুর  ১০ নং গোল চত্বর থেকে ফার্মগেট পর্যন্ত যেতে নূন্যতম এক থেকে দেড় ঘন্টা সময় লাগবেই। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগের স্নাতকোত্তর পর্যায়ের শিক্ষার্থী জুয়েল রহমান বলেন, সকালে ক্লাস থাকলে সবচেয়ে বেশি সমস্যা হয়। ক্লাস শুরুর আগে দুই আড়াই ঘন্টা সময় নিয়ে বাসা থেকে  বের হই। এরপরও মাঝে মাঝে ক্লাস মিস হয়ে যায় যানজটের কারনে।

মীর রাকিব উন নবী

রাজধানীর যানজট নিরসনে ট্যাক্সি, সিএনজি, প্রাইভেট কার মাইক্রোবাস এবং বাস ট্রাক চলাচলের জন্য রাস্তায় আলাদা লেন চিহ্নিত করে দেওয়া হলেও তাতে কোনও কাজ হচ্ছে না। অধিকাংশ চালক এসব লেন নির্দেশক চিহ্ন মানছেন না। যারা লেন মেনে যানবাহন চালাতে চাচ্ছেন তারাও অমান্যকারীদের কারণে মানতে পারছেন না। আর ট্রাফ্রিক পুলিশ লেন মানা হচ্ছে কি হচ্ছে না সে ব্যাপারে নির্বিকার ভুমিকা পালন করছে। স্বভাবতই কমছে না শহরের যানজট।

১৪ জানুয়ারী বৃহস্পতিবার বিকাল ৪ টায় রাজধানীর বাংলামোটর মোড়ে গিয়ে দেখা গেছে এখানে যানবাহনভেদে লেন ভাগ করে দেওয়া থাকলেও তা মানছে না কেউই। ঠিক ট্রাফিক বক্সের সামনেই এ লেন বিভাজন, কিন্তু তারপরও অমান্যকারী চালকদের যেন দেখেও দেখছেন না সার্জেন্টসহ অন্য ট্রাফিক সদস্যরা।

এ ব্যাপারে কর্তব্যরত সার্জেন্টদের দৃষ্টি আর্কষন করা হলে তিনি বলেন, বিকালে যানবাহনের চাপ এত বেশি থাকে যে লেন মানা হচ্ছে কি হচ্ছে না ধরতে গেলে এ রাস্তা দিয়ে গাড়িই চলতে পারবে না। রাজধানীর মিন্টো রোড ও ইস্কাটন এলাকা, নিউমার্কেট, সায়েন্স, ল্যাবরেটরি, ফার্মগেট ও মহাখালীতেও একই চিত্র দেখা গেছে। রাস্তায় যে লেন দিয়ে শুধু প্রাইভেট কার ও মাইক্রোবাস যাওয়ার কথা, সেদিক দিয়ে চলছে কার সি এনজি বাস ট্যাক্সিক্যাব সবকিছুই। পাশেই কর্তব্য পালন করছেন ট্রাফিক পুলিশ, কিন্তু লেন মানা না মানায় তাদের যেন কিছুই যায় আসে না।

বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে আলাপ করে জানা গেছে, মুলত যানজটের প্রধান কারণকে পাশ কাটিয়ে অন্য ছোট খাটো সমস্যা সমাধানের চেষ্টা করলে লাভ তো হবেই না, বরং এ রকম উল্টো ফল আসবে। এ ব্যাপারে পরিবেশ বাচাও অন্দোলনের (পবা) চেয়ারম্যান আবু নাসের খান বলেন,  রাজধানীর যানজটের প্রধান কারণ হচ্ছে প্রাইভেট কার। এখানে প্রাইভেট কার চলার উপযোগী করে রাস্তা তৈরি করা হচ্ছে,  বছর বছর প্রাইভেট কার বাড়ছে আশঙ্কাজনকহারে। কিন্তু সাধারণ মানুষের সহজে যাতায়াতের কোনও ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে না। শহরের দেড় কোটি সাধারণ মানুষের যাতায়াতের সুষ্ঠু বন্দোবস্ত আগে করতে হবে,  না হলে যানজট কমবে না। তিনি বলেন, হাটার উপযোগী সুন্দর ফুটপাথ এবং সহজে সুলভে সর্বত্র যাওয়া যায় এমন পাবলিক বাস ব্যবস্থা চালু করা হলে যানজট কমবে। লেন ব্যবস্থা চালু কিংবা সিগন্যাল বাতি মেনে চলার আদেশও তখন বুমেরাং হবে না।

দিন দিনি যানজট বেড়ে যাওয়া এবং কোনও পরিকল্পনা কাজে না আসার ব্যাপারে সরকারি কর্তৃপক্ষও উদ্বিগ্ন। এ বিষয়ে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের ডেপুটি কমিশনার (ট্রাফিক) শফিকুর রহমানের সঙ্গে কথা বলা হলে তিনি শুধু বলেন, আমরা সমস্যা সমাধানের সর্বোচ্চ চেষ্টা চালাচ্ছি। আশা করি দ্রুতই রাজধানীর যানজট পরিস্থিতির উন্নতি ঘটবে।

দৃশ্যপট-১, শাহবাগ – যাত্রাবাড়ী

১৪ জানুয়ারী বিকালে রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় ঘুরে ভয়াবহ যানজটের বিভিন্ন চিত্র দেখা গেছে। অথচ সাম্প্রতিক সময়ে লেন ব্যবস্থা প্রবর্তন, সিগন্যাল বাতি মেনে চলার আদেশ জারিকরণসহ বিভিন্ন পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে সরকারের পক্ষ থেকে। অধিকাংশ জায়গায় এসব সরকারি আদেশ নির্দেশ মানাই হচ্ছে না। ৪ টা ২০ মিনিট শাহবাগ মোড়ে গিয়ে দেখা গেছে সিগন্যাল বাতি নির্দেশ করছে যানবাহন থামতে,  অথচ সার্জেন্ট হাত নাড়িয়ে নির্দেশ দিচ্ছেন চলতে। মোড় থেকে গাড়ির সারি একদিকে শেরাটন হোটেল, একদিকে কাটাবন মোড়, এবং এক দিকে রমনা ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউট মিলনায়তন পর্যন্ত পৌছে গেছে। এবং গাড়ি এগোচ্ছে শম্বুক গতিতে। এদিন শাহবাগ থেকে জাতীয় প্রেসক্লাব পর্যন্ত প্রায় তিন কিলোমিটার দুরুত্ব পার হতে সময় লেগেছে ৫০ মিনিট। ৫ টা ১০ মিনিটে প্রেস ক্লাবে এসে দেখা গেছে রাস্তার দুই পাশেই গাড়ির লম্বা সারি। একদিকে গাড়ির সারি গিয়ে ঠেকেছে পল্টন মোড় পর্যন্ত। এখানেও রাস্তার চারদিকে চারটি বড় বড় স্থবির যানের সারি।

এরপর গুলিস্তান বঙ্গভবন হয়ে ইত্তেফাকের মোড় পর্যন্ত রাস্তায় ঘুরে দেখা গেছে,  পুরা রাজধানীই আসলে যানজটের খপ্পরে পড়ে আছে। টিকাটুলি ওভার ব্রিজের নিচে গাড়ির লম্বা বাক নেওয়া লাইন ইত্তেফাক ভবনের সামনে দিয়ে এসে রাজধানী সুপার মার্কেট পার হয়ে যেতে দেখা গেছে। রাজধানী সুপার মার্কেট ও স্বামীবাগ পার হয়ে আবার যানজট শুরু। এবারে সায়েদাবাদ বাস টার্মিনাল থেকে জনপথ মোড় পর্যন্ত নিরেট যানবাহনের লাইন। এর মধ্যে একটি সুতোও ঢোকানোর উপায় নেই। আর যানবাহনের মধ্যে বাস রিকশা সিএনজি ট্রাক ট্যাক্সি সবই আছে।

জনপথ মোড় থেকে একটু এগিয়ে দেখা গেল সায়েদাবাদ ভাঙা ব্রিজ থেকে আবার যানজট। এবারে একেবারে যাত্রাবাড়ী ওভার বিজ্র পর্যন্ত। যাত্রাবাড়ী মোড়ে দায়িত্ব পালনরত সার্জেন্টকে যানজটের কারণ জিজ্ঞাসা করা হলে তিনি বলেন,  মূলত বৃহস্পতিবার বিকালে অনেক মানুষ রাজধানী ছেড়ে নিজ নিজ স্থায়ী ঠিকানার উদ্দেশ্যে ছোটেন বলে এই দিন যানজটটা থাকে সবচেয়ে বেশি। যে কারণে ১০ মিনিটের রাস্তা পার হতে এক থেকে দুই ঘন্টা লাগে এবং এটা নগরবাসীর জন্য খুব স্বাভাবিক হয়ে গেছে বলে মন্তব্য করেন তিনি।

দৃশ্যপট-২, মৌচাক- মিরপুর ১০ নং গোলচত্বর

১৭ জানুয়ারী রবিবার সকাল ৯ টায় রাজধানীর মৌচাক মোড়ে গিয়ে দেখা গেছে এখান থেকে যেদিকে চোখ যায় সেদিকেই ছোট বড় যানবাহনের লাইন।  একদিকের লাইন মালিবাগ মোড় ছাড়িয়ে রাজারবাগ পুলিশ লাইন স্কুল পার হয়ে গেছে,  রামপুরার দিকে যাওয়ার রাস্তাটি যতদুর দেখা যাচ্ছিল শুধু স্থবির যানবাহনের চাকা আর ভোগান্তিতে অস্থির মানুষের চেহারা আর কিছুই নেই। মগবাজার মোড়ের দিকে এগোতে গিয়ে প্রথমে ওয়্যারলেস গেট পর্য্নত কিছুটা রাস্তা ফাকা পাওয়া গেল। কিন্তু এরপর থেকে শুরু যানবাহনের লম্বা লাইন। এ লাইন একেবারে মগবাজার মোড় পর্যন্ত। এখানে মিন্টো রোড থেকে তেজগাওমুখী সোজা রাস্তাটি ভি আই পি সড়ক হওয়ায় অপর দিকের মৌচাক থেকে বাংলামোটর মুখী রাস্তাটি দিয়ে চলাচলকারি মানুষ রয়েছেন চরম ভোগান্তির মুখে। কয়েকজন বাস যাত্রীর সঙ্গে আলাপ করে জানা গেল, ভিআইপি রোডে একবার গাড়ি ছাড়লে সেটা পাঁচ মিনিট থেকে দশ মিনিট পর্যন্ত চলে। পুরো রাস্তা ফাকা না হওয়া পর্যন্ত ট্রাফিক আটকায় না। অথচ অন্য রাস্তাটিতে একবারে দুই থেকে তিন মিনিটের বেশি গাড়ি ছাড়া হয় না। এ মোড়ে রিকশা চলাচল নিষিদ্ধ থাকলেও সেটি সবসময় মানা হয় না। একই জায়গা দিয়ে অল্প গতির এবং দ্রুতগতির যানবাহন একসঙ্গে চলাচল করলে স্বাভাবিকভাবেই দ্রুতগতির যানটির গতি কমে যায়। ফলে দুই তিন মিনিটের সিগন্যাল রিকশা গাড়ি বাস সবমিলিয়ে মাত্র দশ বারোটা যানবাহন পার হওয়ার সুযোগ পায়। যে কারণে এই রাস্তা দিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে এক যাত্রীকে নুন্যতম এক ঘন্টা অপেক্ষা করতে হয়। বাস যাত্রীরা আরও বলেন, দিনের যেকোনও সময় এখান দিয়ে যেতে হলে জ্যামে পড়তে হবেই,  এটা নিয়ম হয়ে গেছে।

মগবাজার পার হয়ে বাংলামোটর মোড়ে গিয়ে আবারও যানজট। এ মোড় পার হয়ে একটু সামনে গিয়ে আবারও যানজট। কাওরানবাজার সার্ক ফোয়ারা থেকে শুরু হওয়া গাড়ির সারি শেষ হয়েছে হাতিরপুল কাচাবাজারের সামনে গিয়ে। এর মধ্যে বাংলামোটর দিয়ে এ রাস্তায় ঢোকা যানবাহনগুলোও গিয়ে মিশছে সেই সারিতে। মিশে যানজট আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে। এই রাস্তা দিয়ে যানবাহনগুলো এগুচ্ছে খুবই আস্তে আস্তে। বাংলামোটর থেকে কারওয়ানবাজার মোড় পর্যন্ত যেতেই সময় লাগছে পাকা আধ ঘন্টা। অথচ দুরুত্ব এক কিলোমিটারও হবে কিনা সন্দেহ!

এরপরে কিছুদূর রাস্তা ফাকা পাওয়া গেলেও আবার যানজটের দেখা মিলেছে ফার্মগেটের প্রতম ওভার ব্রিজ থেকে। ফার্মগেট মোড়ে একদিকে বাস ও প্রাইভেট কার  সাব লেনে ঢুকছে,  আবার আরেক সাবলেন দিয়ে গাড়ি মূল রাস্তায় বের হচ্ছে,  এর মধ্যে মূল রাস্তায় গাড়ি চলছে সবমিলিয়ে এক জগাখিচুড়ি অবস্থা। ফার্মগেট মোড় থেকে যানবাহনের লম্বা সার গিয়ে পৌছেছে বিজয় সারনি মোড় পর্যন্ত। এর সামনেও রয়েছে যানবাহনের দীর্ঘ সারি। বিজয় সারনি থেকে বামদিকে বঙ্গবন্ধু নভোথিয়েটার সংলগ্ন রাস্তাটি কিছুটা ফাকা থাকলেও এখানে কিছুক্ষণ পর পর যানজট সৃষ্টি হতে দেখা গেছে।

বছর বছর প্রাইভেট কার বাড়ছে আশঙ্কাজনক হারে। কিন্তু সাধারণ মানুষের সহজে যাতায়াতের কোনও ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে না। শহরের প্রায় দেড় কোটি সাধারণ মানুষের যাতায়াতের সুষ্ঠূ বন্দোবস্ত আগে করতে হবে,  না হলে যানজট কমবে না।

আগারগায়ের বিসিএস কম্পিউটার সিটি পার হওয়ার পর স্থবির যানবাহনের সারি দেখা গেছে একবারে তালতলা পর্যন্ত। এরপরে শেওড়াপাড়া বাস স্টপেজের আগে আবার যানজট। কাজীপাড়া বাস স্টপেজ পার হতেই আবার যানজট,  সেনপাড়া থেকে একেবারে মিরপুর ১০ নং গোল চত্বর পর্যন্ত। এ রাস্তায় নিয়মিত এ রকম ভয়াবহ যানজটের ফলে মানুষের ভোগান্তিও দিনে দিনে বাড়ছে। স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে,  প্রতিদিন সকাল ৮ টা থেকে দুপুর ১ টা পর্যন্ত এবং বিকাল ৪ টা থেকে রাত ৮ টা পর্যন্ত এ রাস্তায় যানজট থাকবেই। এবং এ সময়ে মিরপুর  ১০ নং গোল চত্বর থেকে ফার্মগেট পর্যন্ত যেতে নূন্যতম এক থেকে দেড় ঘন্টা সময় লাগবেই। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগের স্নাতকোত্তর পর্যায়ের শিক্ষার্থী জুয়েল রহমান বলেন, সকালে ক্লাস থাকলে সবচেয়ে বেশি সমস্যা হয়। ক্লাস শুরুর আগে দুই আড়াই ঘন্টা সময় নিয়ে বাসা থেকে  বের হই। এরপরও মাঝে মাঝে ক্লাস মিস হয়ে যায় যানজটের কারনে।