দুদন্ড ধানমন্ডিতে

  • by

দুদন্ড ধানমন্ডিতে

 

মাথার উপরে সদ্য ফোটা লাল কৃষ্ণচুড়ার বাহারি পসরা, ডালে ডালে পাখির কলকাকলি আর হালকা দক্ষিণা বাতাস, সব মিলিয়ে এক প্রাণ চুড়ানো মনোরম আবহ। ইট-কাঠের এই কৃত্রিম নগরের প্রাণ কেন্দ্রে এ রকমই এক টুকরো  মোহময়ী  পরিবেশ নিয়ে স্বগর্বে  নিজেকে জানান দিচ্ছে ধানমন্ডি লেক।  নগরীর ঐতিহ্যেরও একটি অংশ এই লেক। দীর্ঘ লেক, লেকের পাড়ে পার্কের আদলে  বিস্তৃত খোলা জায়গা, বাহারি আর দৃষ্টি নন্দন  নানা প্রজাতির বৃক্ষ, লেকের পানির ওপরে মাথার ওপরে ছাদ দেয়া  বসার স্থান সব মিলে এক কথায় অসাধারণ পরিবেশ। আর এমন চমৎকার পরিবেশ তো মানুষকে টানবে এটাই স্বাভাবিক।  বিশেষ করে ১৯৯৫ সালে সংস্কার কার্যক্রম  এর পর এর আকর্ষণ কয়েকগুণ বেড়েছে মানুষের কাছে।  আর তাই তো প্রতিদিন অসংখ্য মানুষের আগমনে মুখরিত হয় ধানমন্ডি লেক।  তাদের বিশিরভাগই আসে কাজের ফাকে বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা দিতে, কেউবা আবার অবসরে। নানান পেশার, নানান বয়সের  মানুষ প্রতিদিন  আড্ডা  দেয় ধানমন্ডি লেকের বিভিন্ন স্পটে।  তবে তাদের  মধ্যে তরুন-তরুণীদের উপস্থিতি চোখে পরে বেশি।  সকাল থেকেই চলে আড্ডা বাজি।  তবে দুপুর গড়িয়ে  বিকেল নামতেই  সেটা বেড়ে যায়  বহুগুণে।  কেউ ভার্সিটির ক্লাস শেষ করে , কেউ বিকেলের অবসরে  আবার কেউবা অফিস থেকে বের হয়ে  বাসায় যাওয়ার  আগে চুটিয়ে আড্ডা মারে এখানে।

ধানমন্ডি ৩২ নম্বরের  ব্রিজ পার হয়ে লেকে ঢোকার মুখে ডান দিকে লেকের পাড় ঘেঁসে আড্ডা দিচ্ছিল তেমনই  একদল তরুণ-তরুণী। উদ্দেশ্য খুলে বলা মাত্র তারাও সাদরে আমন্ত্রণ জানাল তাদের আড্ডায় যোগ দেয়ার জন্য।  সবাই বেশ প্রণবন্ত আর আন্তরিক আড্ডায়। ঢাকা  বিশ্ববিদ্যালয় এর আলাদা তিনটি বিভাগের শিক্ষার্থী সবাই।  তবে কলেজ জীবনে একই সঙ্গে পড়া এবং সবার বাসা ধানমন্ডি এলাকায় হওয়ায়  এখানে  আড্ডা দেয়া তাদের রুটিন হয়ে গেছে।  স্বাভাবিক ভাবেই তাদের কাছে প্রশ্ন, আড্ডা  দিতে ধানমন্ডি লেকে কেন ? ঢাবির সমাজ বিজ্ঞান বিভাগের  ছাত্র নবীন বলেন ‘দেখতেই পাচ্ছেন কী সুন্দর পরিবেশ। নির্ঝাঞ্জাট খোলামেলা জায়গায় আড্ডা দিতে কার না ভাল লাগে বলুন। সারাদিন তো পিসি আর ফেসবুক নিয়ে পড়ে থাকি।  এর ফাঁকে বন্ধুদের সেঙ্গে আড্ডাটা যদি এমন সুন্দুর জায়গায় হয় তো মন্দ কী!

 

লামিয়া বলেন, আসলে আমরা এই এলাকার বাসিন্দা সেটাও একটা কারণ।  তারপরও ধানমন্ডি লেক কিন্তু  অসাধারণ স্থান আড্ডা দেয়ার জন্য।  লামিয়ার মৃদু প্রতিবাদ করে হিমেল – এই এলাকার  সেটাই আসল কথা নয়, আপনি দেখবেন অনেক দূর থেকেও  মানুষ আড্ডা দিতে  আসে এখানে।  আসলে জায়গাটা  সুন্দর তাই সবাই আসে। আড্ডার স্থান হিসেবে এটা কেমন ? এ প্রশ্নে সবাই একযোগে বলে ওঠে ‘অসাধারণ” ।  নবীন আবার বলে, অবশ্য মাঝে মাঝে বিশেষ করে ছুটির দিনে দর্শনীয়দের আগমন এত বেশী হয় যে, নিরিবিলি আড্ডা দেয়ার সুযোগ নেই। তবে তাতে তো করার কিছু নেই, সবার ভালো লাগে তাই আসে। সামির বলে, ছুটির দিনের ভিড়টাও আবার আরেকদিক দিয়ে উপভোগ্য হয়, অসংখ্য মানুষ আসে।  এক কথায় জমজমাট পরিবেশ।  আর কী থাকে আপনাদের আড্ডায় এমন প্রশ্নে সব তরুণের মতোই তাদেরও সচকিত জবাব- আমাদের আড্ডায় কী থাকে সেটা নয়, বলুন কী নেই ? খুররাম বলেন, জগতের সব পাবেন এখানে। কোনো নির্দিষ্ট টপিক নেই, যা মনে আসে তাই বলি।  গল্প করি, বাদাম-আইক্রিম-ফেরিওয়ালার চা ইত্যাদি যখন যেটা পাই খাই।  এভাবেই সময় কেটে যায়।

 

উদ্যানের মাঝখানে সবুজ খাসের ওপর গোল হয়ে  বসে কাগজ-কলম নিয়ে কাজ করছে একদল তরুণ-তরুণী। কাছাকাছি যেতেই উৎসুক দৃষ্টিতে চাইল দু একজন। উদ্দেশ্য বলার পর তরুণদের মধ্যমণি নিলয় বলেন, অ্যাসাইনমেন্ট করছি ভাই, এই ঝামেলা শেষ হলে আড্ডা দেব।  ধানমন্ডির একটি নামকরা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী তারা।  বললেন,  ’এখন যদিও ক্লাসের কাজ করছি, তবে আমরা নিয়মিত আড্ডা দেই। ক্লাসের  ফাঁকে সুযোগ পেলেই ছুটে আসি বন্ধুরা মিলে। কোনো রুটিন নেই, কোনো ধরাবাধা নিয়ম নেই। সময় পেলেই ছুটে আসি আড্ডা মারতে। এসবের  মতো আরও শত শত মানুষ প্রতিদিন আড্ডা  দিতে আসে ধানমন্ডি লেকে। স্কুল থেকে ভার্সিটি পর্যন্ত সব  বয়সের ছাত্ররা আড্ডা দেন কিছু পঞ্চাশোর্ধ্ব মানুষ, আশপাশের কোচিং সেন্টারগুলোর ছাত্র / ছাত্রীর অভিভাবকরা তাদের অপেক্ষার সময়টুকু কাটায় নিজেদের মধ্যে আড্ডা দিয়ে।  মনের মানুষের সঙ্গে সময় কাটাতে ও কেউ কেউ বেছে নেয় এই সুন্দুর জায়টিকে।

 

পাঁচ নম্বর ব্রিজের কাছে এক চা বিক্রেতাকে ঘিরে জটলা করে আছে কয়েকজন।  সবাব হাতে অফিস ব্যাগ।  আলাপ  করে জানা গের তারা একটি বাজারতাজকারী প্রতিষ্ঠানের কর্মী।  কজ শেষে  বাসায় ফেরার ফথে তাদের ভাষায় একটু হাওয়া খেতে এসেছেন লেকে। কাছাকাছি অফিস, তাই প্রতিদিন  অফিস শেষ করার পর কিছু সময় লেকে আড্ডা দিয়ে তারপর ঘরমুখো হন তারা।  তাদেরই একজন হালিম শেখ বলেন, সারাদিন  কাজের চাপে দম ফেলার সময় পাই না। তাই কাজ শেষে  একটু রিলাক্সড হয়ে বাসায় যাই।  আবার তো কাল সকালে উঠেই দৌড় শুরু হবে। বলতে বলতে হেসে ওঠেন তিনি।  হালিম শেখ  আর তার সহকর্মীরা যখন ফেরিওয়ালার  কেটলির চা শেষ করছিলেন, সেময় কলা বাগান ক্লাবের কাছের ব্রিজের ঢাল থেকে ভেসে আসেতে থাকে গিটারের টুংটাং শব্দ।  ড্যাফোডিল ইনস্টিটিউট অব ইনফরমেশন অ্যান্ড টেকনোলজির একদল ছাত্র সেখানে জমিয়ে তুলেছে চারদিকের পরিবেশ। কাছে গিয়ে দেখা গেল একজনের হাতে গিটার, সবাই মিলে গাইছে গলা ছেড়ে।  শৌখিন  শখের  গিটার বাদক, আড্ডার সময় নিজের অল্পবিস্তর সংগীত প্রতিভা শেয়ার করেন বন্ধুদের সঙ্গে।  বন্ধুরা কেউ গানের শিল্পী না হলেও শৌখিন যখন গিটারের ঝঙ্কার তোলেন তখন কেউ আর চুপ থাকতে পারেন না।সরাসরি প্রশ্ন তাদের কাছে – আড্ডা দিতে লেকে কেন ?  পাল্টা প্রশ্ন করে তন্ময়- কোথায় যাব তাহেলে বলেন?  ভার্সিটি শেষে একটু আড্ডা মারি এখানে। সুন্দর  নিরিবিলি জায়গা। এর মতো আর কোথাও আছে নাকি ? তন্ময়ের মতো দলের আর সবারও একই মত।  সবাই একবাক্যে স্বীকার করে আড্ডার স্থান হিসেবে ধানমন্ডি লেক অনন্য।  তাই আর সবার মতো তারাও নিয়মিতই আড্ডা দেন এখানে।

 

এমনিভাবে যারাই আসেন লেকে আড্ডা দিতে, সবাই একটা জায়গায় একমত, এমন মনোরম পরিবেশ আর হয় না আড্ডার জন্য।  প্রাণ খুলে বন্ধুদের সঙ্গে মনের মতো সময় কাটানোর যে মানুষের সহজাত প্রবণতা তাকে পরিপূর্ণতা দিতেই যেন আড্ডার সব সহায়ক উপকরণ নিয়ে উপস্থিত ধানমন্ডি লেক।  আর তরুণরাও যে তা লুফে নিতে এক মুহুর্তও দেরি করতে রাজি নয়।  তাই তো প্রতিনিয়তই চলে আড্ডাবাজি, বাজে তারুণ্যের জয়ধ্বনি।