পাহাড়চুড়োয় দুর্গ

পাহাড়চুড়োয় দুর্গ

পাহাড়চুড়োয় দুর্গ

 

পাহাড়েরর চুড়োয় একফালি ইতিহাস। পরিত্যাক্ত দুর্গের ফাটল, মন্দিরের কারুকাজে গেছে রাজারাজড়ার  কাহিনি, দেবদেবতার অখ্যান। বেড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে ইতিহাস ছোঁয়ার রোমাঞ্চ এখানে ভ্রমণপ্রেমীর বাড়তি পাওনা।

 

দক্ষিণ ভারতের কর্নাটকের রাজধানী বেঙ্গালুরুর কাছাকাছি ‘দেবরায়ন দুর্গ’  টুমকুর জেলায় অবস্থিত  এই পাহাড়চুড়োর   টুরিস্ট স্পটটি সেই সব  পর্যটকের ভাল লাগবে, যারা পাহাড়  ও প্রাচীন  মন্দির ভালবাসেন।  আজ থেকে দশ বছর আগেও এই শহরটিকে বলা হত  ভারতের  ‘শীততাপ নিয়ন্ত্রিত শহর’ কারণ গ্রীষ্মকালেও এখানে মনোরম থাকতো।  সমুদ্রতল থেকে ৩০৫০ ফুট উচুতে অবস্থিত হওয়ায় শহরটির তাপমাত্রা  গরমের দিনেও অত বেশি হয় না।  যদিও এখন দ্রুত নগরায়ণ ও শিল্পায়নের জন্য  আবহাওয়ার অনেক পরিবর্তন হয়েছে।  তবে  ৪২০০ ফুট উচুতে অবস্থিত দেবরায়ান দুর্গ গ্রীষ্মকালে বেড়াবার পক্ষে আজও উপযুক্ত।

 

বেঙ্গালুরু-পুণে হাইওয়ে দিয়ে পঞ্চাশ কিমি গিয়ে ডোব্বাসপেট পৌছে ডান দিকে দেবরায়ন দুর্গের রাস্তা। এখান থেকেই পাহড়ে ওঠার রাস্তাটা দোক যায়। ছোট ছোট গ্রাম পেরিয়ে পাহাড়ের মাঝামাঝি এসে পৌছালে দেখা যায় চারদিক ঘন জঙ্গল ও পাথরে ঢাকা। দেবরায়ন দুর্গ পাহাড়ের  শুরু ওখান থেকেই।  সামনে দুটো রাস্তা চলে গিয়েছে।  বা দিকের রাস্তা গিয়েছে ভোগ নৃসিংহ মন্দিরের দিকে।  এই মন্দিরের ইতিহাস বলে যে ত্রেতা যুগে ইক্ষ্বাকু বংশের রাজা অম্বরিষ যখন এই পাহাড়ে তপস্যা শেষে উপবাস ভঙ্গ করার উদ্রেগ করে ছিলেন তখন সেখানে ঋষি দুর্বাসা এসে উপস্থিত হন ও রাজাকে বলেন যে, তিনি স্নান করে না আসা পর্যন্ত রাজা যেন অভুক্ত থাকেন। ‍ ক্ষুধা ও তৃষ্ণায় কাতর রাজা ঋষিকে ফিরতে না দেখে  এক গন্ডূষ জলে খেয়ে উপবাস ভঙ্গ করেন ও ঠিক সেই সময়েই সেখানে এসে উপস্থিত হন দুর্বাসা। ঋষি রাজাকে জল খেতে দেখে ক্রুদ্ধ হয়ে অভিশাপ দেন যে, বিষ্ণুর সুদর্শন চক্রে  তার  প্রাণ যাবে।  বলার সঙ্গে সঙ্গে সুদর্শন চক্র রাজাকে তাড়া করে।  নিজের প্রাণ বাচানোর জন্যে রাজা অম্বরিষ ভগবান বিষ্ণুকে স্তব করেন ও  বিষ্ণুর আদেশে সুদর্শন চক্রটি রাজাকে ছেড়ে  ঋকে তাড়া করতে শুরু করে।

 

ঋষি তখন বিষ্ণুর কাছ ক্ষমা চেয়ে নিলে সুদর্শন অদৃশ্য হয়।  ভগবান বিষ্ণু তখন ঋষিকে নৃসিংহরুপে দেখা দেন।  এই কারণেই এই মূর্তিটি প্রতিষ্ঠিত হয়।

 

ঐতিহাসিকদের মতে মন্দিরটি হাজার হাজার বছর আগেও ছিল।  চুতর্দশ শতেকে বিজয় নগরে সম্রাটরা এই মন্দিরটি পুনর্নির্মাণ করেন।  গর্ভগৃহের মধ্যে শ্রীনৃসিংহ বসে আছেন ও তার ডান কোলে দেবী লক্ষ্মী।  মন্দিরের  সামনের গোপুরমটি নির্মাণ করেন সপ্তদশ শতকে মহীশুরের রাজা চিক্কাদেব ওডোয়ার।  নৃসিংহদেবের মন্দিরের কাছেই রয়েছে লক্ষ্মীর মন্দির।  এই ঐতিহাসিক মন্দিরের পিছনে আছে মন্দিরের  পুষ্করিণী।  এখান থেকে অন্য চুড়োটি খুব সুন্দর দেখায়। ঠিক বাঁ দিকে একটু এগিয়ে হনুমান মন্দির। চতুর্দশ শতকে বিখ্যাত বৈষ্ণুব সাধক বদিরাজ মন্দিরটি নির্মাণ করেন।   পাহাড়ের সর্বোচ্চ চুড়ো, উচ্চতা হল ৩৭৫০ ফুট।  অনেক পাখি দেখা যায় এখানে। উল্লেখ্য বিরল হলুদ রঙের বুলবুল পাখি।  চারদিকের সৌন্দর্য বেশ মনোরম। কিছুটা পথ এগিয়েই পাথরের তৈরি এবড়োখেবড়ো একশ মিটার সিড়ি।  সিড়ি দিয়ে উঠে গেলে সামনেই দুর্গের দরজা।  ছোট্ট অথচ সুন্দর এই কেল্লাটি ইতিহাসে নিজের জায়গা করে নিয়েছে।   ত্রয়োদশ শতকে এই দুর্গটি তৈরি করেন স্থানীয় সামন্ত রাজা জাডাকা।  পরে ষোড়শ শতকে বিখ্যাত বিজয়নগর সম্রাট কৃষ্ণদেবরায় এই কেল্লা ও পাহাড়টি দখল করেন।  কেল্লাটিতে ছয়টি প্রবেশপথ আছে।  তবে এখন আর কেউ এর ভিতরে যায় না।  এর সামনে থেকে দেখা যায় পাহাড়ের শীর্ষে অবস্থিত যোগনৃসিংহ মন্দির।  কেল্লার ঠিক উল্টো দিকে পাথরের খোদিত হনুমান ও গরুড়ের সুন্দর মূর্তিটি।  কেল্লার ঠিক উল্টো পিছনেই মন্দিরটি।  পরিবেশ বেশ শান্ত ও সৌম্য।  মন্দিরের ঢোকার আগে ৪২০০ ফুট উচু পাহাড়চুড়োয় দাড়ালে দেখা যায় নীচের অভাবনীয়  সুন্দর উপত্যাকা। মন্দিরের  সামনে পুকুর। গুহরি মতো গর্ভগৃহে যোগাসনে বসে আছেন ভগবান নৃসিংহ। । এ ছাড়া  রয়েছে বৈষ্ণবসাধক রামানুজাচার্যর মুর্তি ও অন্যঅন্য সাধকেদের মূর্তি। ফেরার সময় পাহাড়ের নীচে দেখ যায় জয়ামঙ্গলী নদী । জয়া ও মঙ্গলী  নামক দুট দলধারা মিলে জয়ামঙ্গলী। ছোট্ট একটি গুহাতে রয়েছে রামের মূর্তি।  প্রচলিত কিংবদন্তী অনুসারে বনবাসের  সময় শ্রীরাম, সীতা ও লক্ষণের সঙ্গে এসেছিলেন।   কপলে তিলক পরার পর জন্যে  রাম তির দিয়ে পাথর কেটে জলধারা বের করেছিলেন সেই জলধারা এখনও বইছে।  এর নাম ’নমচিলুমে’ স্থানীয় ভাষায় ’নম’ মানে তিলক।  এখানকার সৌন্দর্য মনকে মুগ্ধ করবেই।

 

দেবরায়ান দুর্গ থেকে বার কিমি দূরে টুমকুর শহরের আশেপাশে রয়েছে অনেক পুরনো সুন্দর মন্দির, পাহাড়, গুহামন্দির, অভয়ারণ্য ও কেল্লা।  এই পাহাড়ের উল্টো দিকেই আছে দুর্গ সংরক্ষিত বন।  এখানে অনেক হরিণ, লেপার্ড, বাঘ অন্যান্য বন্য প্রাণীর দেখা পাওয়া যাবে।

 

কীভাবে যাবেন

বাংলাদেশ থেকে হাওড়া থেকে বেঙ্গালুরু যেতে পারেন-

  • যশবন্তপুর এক্সপ্রেস
  • গুয়াহাট-বেঙ্গালুরু এক্সপ্রেস
  • এ ছাড়া দমদম বিমানবন্দর থেকে প্লেনেও বেঙ্গলুরু যেতে পারেন।

বেঙ্গালুরু পৌছানোর পর-

  • বেঙ্গালুরু থেকে ষাট কিমি দূরে রয়েছে দেবরায়ান দূর্গ।  গাড়ি ভাড়া করে বা বেঙ্গালুরুর কেম্পেগোড়া বাস স্ট্যান্ড থেকে কর্নাটক রাজ্য সরকারের বাসে চড়েও দেবরায়ান দূর্গে যেতে পারেন।  সময় লাগবে দেড় ঘন্টা।

কোথায় থাকবেন

  • কর্নাটক পর্যটন দ্বারা পরিচালিত হোটেল ময়ূরা মেঘদূত। ভাড়া দৈনিক একশত পঞ্চাশ টাকা।
  • এছাড়া রয়েছে বনবিভাগের বাংলো

 


About Author

Khaled

I am Khaled, the owner of the Khaled rent a car.

Make booking here

Calendar is loading...
Powered by Booking Calendar

Subscribe Us

Enter your email address:

Delivered by Khaledrentacar

Skip to toolbar