Category Archives: ভ্রমণ

ভ্রমণকালে হাঁপানি রোগের সতর্কতা

Category : travel , ভ্রমণ

ভ্রমণকালে হাঁপানি রোগের সতর্কতা

শ্বাসকষ্ট বা হাঁপানি রোগ হবার যেমন কোন বয়স নেই তেমনি এটি শুরু হবারও নির্দিষ্ট কোন সময় নেই। যে কোন সময় যে কোন মানুষ এই রোগে আক্রান্ত হতে পারে। তাই হাঁপানি বা অ্যাজমা রোগীদের ভ্রমণকালে বিশেষ সর্তকর্তা অবলম্বণ করতে হবে। অ্যাজমা রোগীর বাস, ট্রাক, ট্রেন ও ট্যাক্সি ইত্যাদি পরিবহনের চলার সময় বিভিন্ন হাঁপানির উদ্রেককারী উৎপাদনের সম্মুখীন হয়। কারণ এস বাহনে থাকে এলার্জি সৃষ্টিকারী নানা রকম বস্তু। যেমন পরিবহনের বসার গদি,  কার্পেট ও বাইরের বাতাস আসা যাওয়ার জানালাগুলোতে জমে থাকা ধুলো এবং সবচেয়ে ক্ষতিকর ছত্রাক। সাধারণত সিগারেটের ধোয়া ও দুষিত বায়ু হাঁপানি রোগীর জন্য সবচেয়ে ক্ষতিকর। তাই এসব রোগীর ভ্রমণের সবচেয়ে উত্তম সময় হচ্ছে খুব ভোরে এবং রাতে। কারণ এ সময় বায়ু দুষণ কম হয়। অ্যাজমা রোগীদের ক্ষেত্রে দূরের পথ ভ্রমণের সময় শীততাপ নিয়ন্ত্রিত কক্ষে থাকাই শ্রেয়। যাদের শ্বাসকষ্টের পরিমাণ বেশি এবং যারা ইনহেলার ও নেবুলাইজার ব্যবহার করে থাকেন তাদের জন্য ইনহেলার ও বহনযোগ্র নেবুলাইজার ভ্রমণের সময় সঙ্গে রাখতে হবে। এছাড়াও রোগীরা  কোন বাহনে চলাচলের পূর্বে বাহনের দরজা বা জানালা বেশ কিছুক্ষণ সময় খুলে রাখলে ভাল। এতে করে পরিবহনে অ্যাজমা সৃষ্টিকারী এলার্জির পরিমাণ কিছুটা কমে যায়।

শ্বাসকষ্টের রোগীদের জন্য বিমান ও জাহাজে চলাচল করা কিছুটা নিরাপদ। কারণ আর্ন্তজাতিক বিমার রুটে

ভ্রমণকালে হাঁপানি রোগের সতর্কতা

ভ্রমণকালে হাঁপানি রোগের সতর্কতা

ধুমপান পুরোপুরি বর্জিত না হলেও অভ্যন্তরীন বিমানের ক্ষেত্রে ধুমপান সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করা হয়েছে। আর বর্তমানে জাহাজে ভ্রমনকারীদের জন্য বিভিন্ন স্বাস্থ্য ব্যবস্থা ও সুচিকিৎসার ব্যবস্থা করা হয়েছে। তথাপিও হাঁপানি রোগীদের জন্য বিমান চলাচলের ক্ষেত্রে ক্ষতিকর দিক হচ্ছে বিমানের অভ্যান্তরীন বায়ু। বিমানে ভ্রমণের সময় অ্যাজমা রোগীদের উপদেশ হাঁপানি রোগীর যদি কোন খাবারে এলার্জি থাকে তবে তাকে বিমানের খাদ্য গ্রহণের পূর্বেই সতর্ক হতে হবে। আমরা যতটুকু জানি, বিমানের খাদ্য সাধারনত আসে বিভিন্ন সরবারহকারী ঠিকাদার প্রতিষ্ঠান হতে। তাই এ সকল খাবার কী কী উপাদান দ্বারা  তৈরি তা জানা সম্ভব নয়। বিমানের খাদ্যর এলার্জি থেকে বাঁচতে রোগীকে সাথে এন্টি এলার্জিক ইনজেকশান রাখতে হবে। বিমান কর্তৃপক্ষের সাথে আগে থেকেই আলাপ আলোচনা করতে হবে যাতে রোগীর প্রয়োজনের সময় পর্যাপ্ত পরিমাণে অক্সিজেন সরবরাহ করা হয়। বিমানের ভিতরের বায়ু খুবই শুষ্ক। রোগীর নাকের ভেতরের অংশ আদ্র বা নরম রাখার জন্য নাকে ১ ঘন্টা পর পর স্যালাইন স্প্রে করতে হবে। যে সকল অ্যাজমা রোগীদের সাইনোসাইটিস ও কানের সমস্যা রয়েছে তারা বিমানে ভ্রমণের সময় অত্যাধিক যন্ত্রণা ভোগ করতে পারেন। সেক্ষেত্রে তারা প্রদাহ বিরোধী স্প্রে করতে পারেন। জাহাজে চলাচলকালে হাঁপানি রোগীদের জন্য পরামর্শ জাহাজে ভ্রমণের সময় শ্বাসকষ্টের রোগীরেদ সাথে করে এপিনেফ্রেনি ইনজেকশন রাখতে হবে। এ ক্ষেত্রে হাঁপানি রোগীদের যে ব্যাপারে সবচেয়ে বেশি খেয়াল রাখতে হবে তা হল জাহাজে যাত্রীদের জন্য সুচিকিৎসা স্বাস্থ্যসেবা পর্যাপ্ত কিনা।

পরজীবী ও ছত্রাক দ্বারা দুষিত ধুলোর কারণে এলার্জিজনিত অ্যাজমার প্রকোপ বাড়ে। আর এই ধুলো মিশে থাকে ঠান্ডা বা স্যাঁতস্যাঁতে আবহাওয়ায়। জাহাজে ভ্রমণকালে যাত্রীদের বিভিন্ন জলবায়ু ও আবহাওয়ার সম্মুখীণ হতে হয়, সেক্ষেত্রে অ্যাজমা রোগীদের সাবধান থাকতে হবে। এছাড়া উষ্ণ ও আদ্র আবহাওয়া থেকেও রোগীদের সতর্ক থাকতে হবে। কারণ এতে থাকে বায়ুবাহিত ছত্রাক, ফুলের রেণু ও পরজীবি।

অ্যাজমা রোগীর ভ্রমণকালে যে স্থানে থাকবে সে স্থান সম্পর্কে সাবধানতা

ভ্রমণের সময় বেশির ভাগ মানুষকেই হোটেল থাকতে হয়। সেক্ষেত্রে হাঁপানি রোগীকে এলার্জি গ্রুফ কক্ষে থাকতে হবে। এতে করে রোগী অ্যাজার প্র্রকোপ বৃদ্ধিকারী অ্যালার্জেনসমূহ যেমন- ঘরের মাদুর,  কার্পেট, পাপোষ জমে থাকা ধুলোবালি, ছত্রাক ও মাইট নামক অর্থোপৎ জীব থেকে বাচতে পারে। কর্তৃপক্ষকে আগে থেকেই সর্তক করতে হবে যাতে ঘরে বিড়াল বা ইঁদুর প্রবেশ করতে না পারে। কক্ষের চাদর ও বালিশ নিজেরা নিয়ে গেলে ভাল হয়। ঘরের যাতে পর্যাপ্ত রৌদ্র প্রবেশ করতে পারে সেদিকে  লক্ষ্য রাখতে হবে। সুইমিংপুল থেকে দূরে হাকা ভাল। ঘরে প্রবেশের পুর্বে এর দরজা জানালা কিছুক্ষণের জন্য খুলে রাখলে ভাল।

এছাড়াও হাঁপানী রোগীদের কারও বাড়িতে ভ্রমণের পূর্বে লক্ষ্য রাখতে হবে সে বাড়িতে পোষা প্রাণী আছে কিনা ? কারণ পোষা প্রাণীদের লোম, লালা ও প্রস্রাবে থাকে প্রচুর ছত্রাক। যা কিনা অ্যাজমা রোগীদের জন্য খুবই মারাত্মক। এ জাতীয় রোগীদের বিশেষ বিশেষ অনুষ্ঠানের খাবার  এড়িয়ে চলতে পারলে ভাল। কারণ এ সকল খাদ্য বিভিন্ন আলার্জি সৃষ্টিকারী উপাদান দ্বারা তৈরি হতে পারে। এছাড়াও অ্যাজমা বা হাঁপানি রোগীদের খেলাধুলা, ক্যাম্পিং কিং ইত্যাদি বিভিন্ন রকম বিষয় বা শ্বাসকষ্টের প্রকোপ বাড়াতে পারে সে সকল বিষয়    এড়িয়ে চলতে হবে। কারণ বেশি  রৌদ্রের ফলেও অ্যাজমা বেড়ে যেতে পারে। সর্বোপরি, অ্যাজমা বা হাঁপানি রোগীদের ভ্রমণ কালে তাদের প্রয়োজণীয় ওষুধ এন্টিহিস্টামিন,  ব্রংকোডাইলেটর, নিজে পুশ করার মত এপিনেফ্রিন ইনজেকশন এবং কর্টিকোষ্টেরোড সঙ্গে রাখতে হবে। ওষুধগুলো এমন জায়গায় রাখতে হবে যাতে প্রয়োজনের সময় খুব দ্রুত সেগুলো পাওয়া যায়। নিজের দেশ ছেড়ে অন্য কোন দেশে গেলে সেক্ষেত্রে পোর্টেবল নেবুলাইজার নিতে হবে। ওষুধ কেবল সঙ্গে নিলেই হবে না, সেগুলো নিয়ম করে সেবন করতে হবে। কোন অ্যাজমা রোগী যদি নিশ্চিন্তে ভ্রমণ করতে চান, তবে তার জন্য  সবচেয়ে শ্রেয় হবে ভ্রমণের পূর্বে অ্যাজমা বা এলার্জি বিশেষজ্ঞের নিকট হতে সঠিক পরামর্শ গ্রহণ করা। এতে করে হাঁপানিতে আক্রান্ত ভ্রমণকারীর যাত্রা হবে সুনিশ্চিত ও আনন্দদায়ক।

 

অধ্যাপক ডা. এ কে এম মোস্তফা হোসেন

বক্ষ্যব্যাধি বিশেষজ্ঞ


আংকর ভাট – Angkor Wat

Category : travel , ভ্রমণ

আংকর ভাট – Angkor Wat

এশিয়ার ঐতিহ্যের মুকুট মনি

কাজী আনিস উদ্দিন ইকবাল

 

কাম্পুচিয়ার নাম দীর্ঘমেয়াদী রক্তক্ষয়ী গৃহযুদ্ধের কারণে আমাদের অপরিচিত নয়। আদর্শবাদের নামে বিংশ শতাব্দীর বর্বরতম নৃশংসতার জন্যে এই দেশটি কিলিং ফিল্ড হিসাবে সারা বিশ্বে একদিকে ঘৃণা অন্যদিকে সহানুভুতির সঞ্চারক। কিন্তু এই দেশটির অতীতে স্থাপত্য ও শিল্পকলার চর্চার যে বিষ্ময়কর ঐতিহ্য রয়েছে তা মাথার খুলির মিউজিয়াম এবং অত্যাচারের জেল কুঠুরিগুলো যেখানে বাঙ্গালি কুটনীতিকেরও জীবন দিতে হয়েছে, তা দেখলে বিশ্বাস হতে চায় না। যেই যুগে ভারতে হিন্দু এবং বৌদ্ধ মতানুসারীরা একে অপরকে নিধন করছে, সে সময়ে কাম্পুচিয়ায় ওরার মিলে মিশে অবিশ্বাস্য সব বিশাল বিশাল মন্দির, স্তুপ গড়ে তুলেছে। ধর্ম, শিক্ষা ও সংস্কৃতিতে উন্নত ভারতীয়রা এক কালে বিনা রক্তপাতে জয় করেছিল  দক্ষিণ ও দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ার দেশগুলির মানুষের হৃদয় যার প্রমাণ হিসাবে এ অঞ্চলে হিন্দু ও বৌদ্ধ ধর্ম মতবাদের প্রচার ও স্থায়ীত্বকে গ্রহণ করা যায়। কোন সমাজের কোন একটি সামাজিক বৈশিষ্ট্য রাতারাতি যেমন গড়ে ওঠেনা, তেমনি হঠ্যাৎ করে বিলীনও হয়ে যায় না। এ ধরনের বৈশিষ্ট্যগুলির মূল কাঠামো হারিয়ে গেলে বা কার্যকারিতা ফুরিয়ে গেলেও তার ছাপ রয়ে যায়, ভাষায়, শিল্প সাহিত্যে, স্থাপত্যে, বাড়ী ঘরে  এবং নানা লোকাচারে। জাতির ইতিহাসে যদি গর্ব করার মত কিছু থাকে তাহলে তাকে জানবার ও জানাবার প্রয়োজন রয়েছে। বিষয়টি যুদ্ধ উপদ্রুত কাম্পুচিয়ার জনগন বুঝতে পারলেও আমরা বাঙ্গালীরা বুঝিনা। প্রাচীন ভারতের অংশ হিসাবে আমরাও সকল ঐতিহাসিক গৌরবের অংশীদার অথচ আমরা যেন কত তাড়াতাড়ি ওসব কথা ভুলে যেতে পারি সে চেষ্টায় আছি।

কাম্পুচিয়ার বেশিরভাগ অংশই কিন্তু সমতল ভুমি এবং এর অনেকাংশেই বর্ষাকালে পানি জমে। বর্ষাকাল আমাদের দেশের মতই, জুন থেকে শুরু হয়। মেকং ছাড়াও পানির উৎস হিসাবে টনলে স্যাপ হ্রদ বা সরোবার কিন্তু বেশ বড় এবং ভরা বর্ষায় এর চারদিক ছাপিয়ে এর আকার চারগুণ বেড়ে যায়। পানি নামলে নীচু জমিতে ফসল চাষ চলে। বৃষ্টি, হ্রৃদ, নদী, খাল বিল এক কথায় পানি কাম্পুচিয়ার কৃষি নির্ভর সমাজে বিশেষ তাৎপর্য বহন করে। আমাদের আলোচ্য প্রাচীন অংকর নগরীর ( Angkor Wat ) পরিকল্পনায় পানির ব্যবহারের একটা দক্ষ ব্যবস্থাপনা লক্ষ্য করা যায়।

দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ার বেশিরভাগ দেশ সভ্যতার আলো দেখতে পেয়েছিল ভারতের কাছ থেকে। বার্মা থেকে  ইন্দোনেশিয়া এসব অঞ্চলের সাথে চীন দেশের যোগাযোগ থাকলেও, চীনের অভিজাত শ্রেণী ওদের মানুষ মনে করেনি, কিন্তু বর্ণভেদে বিভক্ত ভারতীয়রা কিভাবে ওদের কাছে জনপ্রিয় হল এমনকি নিজেদের ছোট ছোট স্থানীয় ধর্মমত বির্সজন দিয়ে ‍হিন্দুত্ব বা বৌদ্ধ মতবাদ  গ্রহণ করল তা গবেষণার দাবী রাখে। শোনা যায় বাঙ্গালী ধর্ম পন্ডিত অতীশ দীপংকর গিয়েছিলেন বার্মায় ( পাগান) ধর্ম শিক্ষা দিতে। হয়ত কোন একদিন গবেষকরা এও বলে দিতে পারবেন আরও কত বাঙ্গালী ওসব দেশে গিয়ে রান্না শিখিয়েছে,  ইট গাথতে শিখিয়েছে। ভাষা হিসাবে সংস্কৃত এসব অঞ্চলে কি মর্যাদা পেয়েছে তা ইন্দোনেশিয়ার প্রধানমন্ত্রী ‘মেঘবতী সুকর্ণপুত্রী’র নামটি লক্ষ্য করলেই বোঝা যাবে।

আজকের কাম্পুচিয়া যাকে এখনও আমরা কম্বোডিয়া বলে চিনি, তার ইতিহাস জানতে হলে অবস্থানগত বিষয়গুলি বোঝা দরকার। দক্ষিণ পূর্ব  এশিয়ার অন্যতম দীর্ঘ নদী মেকং, যার উৎপত্তি তিব্বতে এবং চীন, লাওস হয়ে কাম্পুচিয়ার বুক চীরে ভিয়েতনামের দক্ষিণাংশ ভেদ করে সমুদ্রে গিয়ে মিশেছে। কাম্পুচিয়ার সমতল ভুমির বেশিরভাগই এই মেকং নদীর দুই পাশে। পশ্চিম ও উত্তর পশ্চিম পাহাড়ী এলাকা। এই পাহাড়ী এলাকার বিভিন্ন ঝর্ণা থেকে টানলে স্যাপ’ নামে একটা সরোবর সৃষ্টি হয়েছে, তা থেকেই ‘টনলে স্যাপ’ নদী। এই নদী তুলনায় ছোট হলেও দক্ষিণ ভিয়েতনাম হয়ে চীন সাগরে শেষ হয়েছে। আমাদের আংকর নগরী উত্তর পশ্চিম এই পাহাড়ী এলাকার মাঝখানে একটা উচু সমতল ভুমিতে অবস্থিত। আংকর এলাকার কিছুটা দক্ষিণেই ‘টানলে স্যাপ’ সরোবর।

ইতিহাসের পাতা

কাম্পুচিয়ার মানুষের বসতির চিহ্ন গবেষকরা ( ৬০০০) ছয় হাজার বছর আগেও ছিল বলে প্রমাণ পেয়েছেন। এই মানুষের জাতি, বর্ণ নির্ণয় না করা গেলেও তারা যে মূলতঃ কৃষিজীবি চিল সে সমন্ধে সকলে নিশ্চিত। কয়েকটি প্রত্নতাত্বিক আবিষ্কারের মধ্যে দিয়ে জানা গেছে ঐ জনগোষ্টী সেই গুহা থেকে ধাপে ধাপে গ্রাম ভিত্তিক জীবন যাপনে অভ্যস্থ হয়েছিল। এই জনগোষ্টীর ধারাবাহিকতার চিহ্ন ১০০ খৃষ্টাব্দ পর্যন্ত পাওয়া গেছে।

সমসাময়িক কালে চীন এবং ভারতবর্ষ ছিল রীতিমত উন্নত সমৃদ্ধ দেশ। চীন দেশের সাথে ভারতবর্ষের পাহাড়ী স্থল পথে যে বানিজ্য ছিল সে পথগুলি প্রায়শঃ বর্বর যাযাবর উপজাতীগুলোর আক্রমণে বিপদ সংকুল হয়ে উঠেছিল। উভয় অঞ্চলের বণিকরা নৌপথে যোগাযোগের একটা পথ খোজ করছিল, চীনা পরিব্রাজকদের ভাষায় ‘দক্ষিণের সমুদ্র উপকুলের বর্বরদের দেশের’ মধ্য দিয়ে একটা পথের সম্ভাব্যতা যাচাই চলছিল। এ সময়ে ভারতবর্ষের পূর্বাঞ্চলের উপকুল থেকে ময়ুরপঙ্খী নাও সাজিয়ে নাবিকরা যাত্রা করলেন চীনের উদ্দেশ্যে। রূপকথার মতা শোনালেও একথা সত্যি ভারতীয়রা বঙ্গোপসাগরের উপকুল ঘেষে চলতে চলতে বর্তমান বার্মা থেকে শুরু করে কাম্পুচিয়া, ভিয়েতনাম, মালেশিয়া, ইন্দোনেশিয়ার দ্বীপপুঞ্জে পৌছে গেল। ধারণা করা যায় আমাদের বাংলাদেশের উপকুলীয় অঞ্চলের লোকেরাও  এই সব অভিযানে অংশগ্রহণ করেছিল। এসব এলাকার জনঘনত্ব যেমন কম ছিল, তেমনি তাদের অনুন্নত জীবন যাত্রা, ধর্ম ও অন্যান্য লোকচারের সীমাবদ্ধতার বিপরীতে ভারত থেকে আগত এসব অভিযাত্রীদের জ্ঞান, প্রযুক্তি এব শিক্ষা সংস্কৃতি ছিল অনেক অগ্রসর। উল্লেখ্য ভারতীয়রা এখানে যুদ্ধ করতে আসেনি, এসেছে ব্যবসার পথ খুজতে, এসব অভিযাত্রী সওদাগররা ছিল নমনীয়, তারা স্থানীয় জনসাধারণের সাথে সখ্যতা গড়ে তুলতে আগ্রহী, নিজেদের বাজার সৃষ্টির তাগিদে ভারতীয় সংস্কৃতির উন্নত দিকগুলি এরা ছড়িয়ে দিতে উদ্যোগী হন। সবচেয়ে সফলতা পায় সংস্কৃত ভাষা এবং হিন্দু ধর্ম। বর্ণাশ্রয়ী হিন্দু ধর্মের কঠোর নিয়ম কানুন শিথিল ভাবে উপস্থাপন করে তারা স্থানীয় মেয়েদের সাথে সংসার পেতে বসে। যখন ভারতীয়রা পাকাপোক্ত আসন তৈরী করে ফেলেছে, তখনও চীনারা এদের বর্বর বলে দুরে সরিয়ে রাখল। তবে সংস্কৃত ভাষার গ্রহণযোগ্যতা ছিল অমোঘ, কারণ তৎকালীন বিশ্বের সবচেয়ে উন্নত ভাষাগুলির  একটি হল সংস্কৃত। তাই রাজ দরবারের ভাষা হিসাবে স্বীকৃত পেল সংস্কৃত। রাজতন্ত্র সহায়ক হিন্দু ধর্মীয় প্রথাগুলি স্থানীয় রাজাদের কাছে অধীক উপযোগী মনে হওয়ায় ওরা হিন্দুত্ব বরণ করে দেবতাকুলের সাথে অতি সত্বর যোগাযোগ স্থাপন করে ফেলল। পরবর্তী কালে ভারতবর্ষের আরেক প্রভাবশালী দর্শন বৌদ্ধ ধর্ম ও এসব অঞ্চলে একচ্ছত্র জনপ্রিয়তা লাভ করে। আরও পরে ভারতবর্ষের মতই ইসলাম ধর্ম বৌদ্ধ ধর্মে স্থান অধীকার করে, বিশেষতঃ মালেয়েশিয়া এবং ইন্দোনেশিয়ার। ভারতীয়দের এই সাংস্কৃতিক বিজয়ের একটা রূপকথা প্রচলিত আছে, ভারতের এক রাজপুত্র ( কৌদিন্য) কম্বোজ ( কাম্পুচিয়া) দেশে বানিজ্যে এলেন। রাজপুত্রদের যা হয়, ব্যবসায় মন নেই, নাগরাজ কন্যা সোমার প্রেমে পড়ে গেলেন এবং নানা নাটকের পর তাদের মিলন হল। নাগরাজ জলাভুমির জল শুষে নিয়ে একটা বিশাল রাজ্য বের করে কন্যা জামাতকে উপহার দিলেন। সেই হল কম্বোজ দেশ বা আজকের কাম্পুচিয়া। কিছু কিছু ঐতিহাসিক কৌদিন্যের বংশের ঠিকুজিও খুজে বের করে জানাচ্ছেন, কৌদিন্য দক্ষিণ ভারতের চোল রাজবংশের কোন রাজপুত্র হতে পারে। আর নাগকন্যা সোমা ? সে কিন কোন সাপুড়ের মেয়ে ? কে জানে, তবে কোন রাজবংশের উপাধী নাগ হতে পারে, নাগ উপাধী এদেশের হিন্দুদের মধ্যেও পাওয়া যায়। তবে এ কাহিনী ইঙ্গিত দিচ্ছে যে ভারতীয়রা সমাদরের ( জামাই আদরে) সাথেই স্থানীয় জনগনের কাছে গৃহীত হয়েছিল।

আগেই বলেছি দক্ষিণ পুর্ব  এশিয়ার এই দেশগুলিতে ভাষা, সংস্কৃতি এবং ধর্মের উপর ভারতীয় প্রভাব তাদেরকে ওই সময়ে অনেক অগ্রসর করে দিয়েছে। ছোট ছোট গোত্রে বিভক্ত হয়ে, নদীর পাড় ঘেষে যে কৃষিজীবি সমাজ ছিল, একে অপরের মধ্যে কলহ হতো, তা সে ঐ লুটপাট পর্যন্ত, কিন্তু দখল করে রাজ্য বিস্তার, শাসন, বিভিন্ন গোত্রের মধ্যে সমন্বয় করে একটা জাতির উদ্ভব হওয়া, এগুলো ভারতীয়দের কাছ থেকে দিক্ষা নেওয়ার ফল। কৌটেল্যের অর্থ শাস্ত্রে আছে, রাজ চক্রবর্তী বা মহারাজার কর্তব্য একটা নব ধর্ম চালু করা’। রাজ ধর্ম হিসাবে হিন্দুমত ভারতে যুগ যুগ ধরে কার্যকারিতা প্রমান করেছে। এ অঞ্চলের নব্য রাজার বংশানুক্রমিক ভাবে প্রজাদের মাঝে নিজেদের রাজ ভাবমূর্তি প্রতিষ্ঠার এমন মন্ত্র আগ্রহের সাথেই গ্রহণ করেছেন। কিন্তু ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা দ্বীপপুঞ্জ এবং মূলভুমি একই সাথে অগ্রসর হয়নি। উপরের চার্টটি দেখলে এ অঞ্চলের অন্যান্য প্রাচীন রাজ্যগুলি সম্বন্ধে ধারণা স্পষ্টতর হবে বলে মনে করি।

অংকর যারা গড়েছেন সেই রাজ বংশ এবং তাদের শাসনকাল সবহ খেমার নামে অভিহিত। খেমার রুজ গেরিলা যোদ্ধাদের নামটি মনে হয় সেই অতীত ঐতিহ্যকে স্মরণ করিয়ে দেবার জন্য গ্রহণ করা হয়েছিল। পাথর খোদাই করে সে কালের মানুষেরা জানানোর চেষ্টা করেছেন, ভগবান শিব নিজে কাম্বু স্বয়ম্ভুবা নামে জনৈক মনীঋষি যিনি কাম্বুজদেশের সকল অধিবাসীর আদি পিতা, তাকে মেরা নামের এক স্বর্গীয় অপ্সরীর সাথে বিবাহ দেন। সেই কাম্বু এবং মেরা নাকি খেমার রাজাদের পূর্ব পুরুষ। এর আগে কৌদিন্য এবং সোমার গল্প বলেছি, তবে ঐতিহাসিকরা বলেছেন এই রাজবংশের প্রতিষ্ঠাতা হলেন ২য় জয়বর্মন। তৎকালীন জনৈক আরব বনিকের লেখা থেকে জানা যাচ্ছে যে, শৈলেন্দ্র রাজা হঠ্যাৎ আক্রমণ করে এখানকার তরুন রাজাকে ( রাজেন্দ্র বর্মণের ছেলে) হত্যা এবং রাজ্য দখল করে। অনেক বন্দী সাথে এই জয়বর্মনও শৈলেন্দ্র রাজ্যের দরবারে নীত হয়েছিলেন ( এছাড়া ২য় জয়বর্মনের আর কোন ঠিকুজি মেলেনি এবং নামের সাথে বর্মন যুক্ত থাকায় রাজবংশের সাথে আত্মীয়তার সম্ভাবনা ধরে নেয় যায়)। ২য় জয়বর্মন ইন্দোনেশিয়া থেকে ফিরে  এসে দেশকে মুক্ত খেমার রাজ্য প্রতিষ্টা করলেন। তার রাজত্ব কাল ছিল ৮০২-৫০ খৃষ্টাব্দ। প্রথমে হরিহরালয় ( বর্তমানে যাকে রুলুস বলা হয়) পরে মহেন্দ্র পর্বত ( বর্তমান নমকুলেন ) ছিল তার রাজধানী। নম অর্থ পর্বত, নমকুলেনে এসে তিনি নিজেকে দুনিয়ার রাজা বলে দাবী করে বসলেন এবং নব ধর্ম পথ বাতলে দিলেন, এখন তিনি হলেন দেব রাজা অর্থ্যাৎ তিনি রাজাও আবার দেবতাও। কিন্তু দেব রাজা অমর হতে পারলেন না এবং ৮৫০ খৃষ্টাব্দে লোকান্তুরিত হলেন। পাথরের গায়ে খোদাই করা বিভিন্ন লেখা থেকে ২য় জয়বর্মণের বংশ তালিকায় ৩৯ জন রাজার নাম মিলেছে। ১ম ইন্দ্রবর্মন ( ৮৭৭-৮৯) পাহাড় সদৃশ মন্দির বাকং, পুর্ব পুরুষদের উদ্দেশ্যে নিবেদন, প্রিয়াহ কো মন্দির নির্মাণ এবং ইন্দ্রততক নামে দিঘী খনন করান। এর পর থেকে এই বংশের রাজাদের মধ্যে পুর্ব সুরীদের চেয়ে বড় কিছু নির্মাণ করার একটা ধারা লক্ষ্য করা যায়। ওর ছেলে যশবর্মণ (৮৮৯- ৯০০) বাবার খনন করা দিঘির মাঝ খানে পূর্ব পুরুষদের উদ্দেম্যে নিবেন করলেন লোলেই নামে এক মন্দির। এই যশবর্মনই তার রাজধানী নম কুলেন থেকে যশোধরাপুরে  ( বর্তমান আংকর) স্থানান্তরিত করেন। সেই শুরু হল আংকারের উত্থান  এবং পরবর্তী ৫০০ বছর ধরে খেমার রাজাদের প্রধান হিসেবে আংকর টিকে রইল। এই দীর্ঘ সময়ের মধ্যে দুয়েকজন খেমার রাজা অন্যান্য স্থানে রাজধানী নির্মাণের চেষ্টা করলেও তা নানা কারণে স্থায়ী হয়নি। ১ম যশবর্মণের দুই পুত্র পর পর রাজা হয়েছিলেন তারপর গণেশ উল্টে (বিদ্রোহের মাধ্যমে) এই বংশের চতুর্থ জয়বর্মন ( ৯২৮- ৯৪৪) রাজা হলেন। এই ভদ্রলোক রাজধানী আংকরের উত্তর পূর্বে কোহ করে এ স্থানান্তরীত করেছিলেন কিন্তু তার ভাগনা ২য় রাজেন্দ্রবর্মন আবার যশেধরপুরে (আংকর) তা ফেরত নিয়ে আসেন। রাজেন্দ্রবর্মন পুর্ব মেবন এবং প্রিরূপ এই ‍দুটি মন্দির নির্মান করেন। তিনি আবার চম্পা  দেশ আক্রমণও করেছিলেন। ওর ছেলে ৫ম জয়বর্মন শাসন করেছেন ৯৬৮ থেকে ১০০০ খৃষ্টাব্দ অবধি এবং তিনি বান্টি শ্রেয়ী মন্দির ( গুরুর উদ্দেশ্যে নিবেদিত) এবং টা কিও নামের মন্দির প্রতিষ্ঠা করেন। বান্টি শ্রেয়ীকে বলা হয় মহিলাদের মন্দির এবং রিলিফ ভাষ্কর্যের নৈপুন্যের দিক থেকে খেমার রাজ্যের আর কোন  ইমারতই এর সমকক্ষ নয়। এর পর রাজা হলেন ১ম সূর্যবর্মন ( ১০০২- ৫০) , তার সময়েই খেমার রাজ্য সবচেয়ে বেশি বিস্তার লাভ করে, তিনি থাইল্যান্ডের মধ্যে ও দক্ষিণাঞ্চল করায়ত্ত করেন। তারপর উল্লেখযোগ্য রাজা হলেন ২য় সূর্যবর্মন, যার নামের সাথে বিশ্বের অন্যতম আশ্চর্য ভবন ‘আংকর ভাট মন্দির’  নির্মাণের গৌরব গাথা জড়িত। ২য় সুর্যবর্মন যেমন বিষ্ময়কর নির্মাতা ছিলেন তেমনই রাজনীতিবিদ এবং সেনাপতিও ছিলেন,  তিনি চিনের সূং রাজাদের সাথে সখ্য গড়ার উদ্যোগ নেন এবং তার সেনাবাহিনী চম্পা রাজ্য আক্রমণ করে তছনছ করে এবং যথেচ্ছ লুন্ঠন চালায়। বলাই বাহুল্য নৃশংসতা ও নিষ্ঠুরতা সবসময়ই  বিজয়ীর মুকুটের মণি হিসাবে শোভা পেয়েছে। চম্পা রাজারাই বা তা মেনে নেবে কেন ? তৎকালীন চম্পা বর্তমান ভিয়েতনামের মানুষ যে প্রতিরোধ করতে জানে তা নিকট অতীতের মার্কিণ যুক্তরাষ্ট্রের পরাজয়ের ইতিহাসের দিকে তাকালেই স্পষ্ট হবে। ইতিহাস বলছে, চম্পারা ১১৭৭ খৃষ্টাব্দে মেকং নদীর উজানে সুকৌশলে এক অতর্কীত আক্রমণের মাধ্যমে আংকর দখল করে এবং পুড়িয়ে দেয়। খেমারদের ইতিহাসে চরমতম পরাজয়। এরপর চার বছল চম্পাদের অধীকারে ছিল আংকর। ৭ম জয়বর্মন ১১৮১ খৃষ্টাব্দে রাজ্য পূনরুদ্ধার করলেন। জয়বর্মন জাতিকে পূর্বের পরাজয়ের গ্লানি  ভোলাতে ১১৯০ সালে আবার চম্পা আক্রমণ করে রাজ্য ভুক্ত করেন এবং ওদের রাজাকে বেধে নিয়ে আসেন আংকারে। ৭ম জয়বর্মন ৫৫ বছর বয়সে ক্ষমতা গ্রহণ করেন এবং ৪০ বছর রাজত্ব করেছেন। তারা এই সুদীর্ঘ রাজত্ব কালে রাজ্য সীমা ভিয়েতনাম, বার্মা ( তৎকালীন পাগান), মালয় উপকুলীয় এলাকা পর্যন্ত বিস্তারিত ছিল। এই জয়বর্মন মহাযান ‍বুদ্ধ ধর্ম মতের অনুসারী ছিলেন এবং এই ধর্ম মতকে প্রতিষ্ঠা দেবার জন্য তিনি বিখ্যাত বাইয়ন সহ অনেক বৌদ্ধ মন্দির ও স্তুপ নির্মাণ করেন। নির্মাতা হিসাবে তিনি এক হিসাবে খেমার রাজাদের মধ্যে সর্বোচ্চ আসন অধীকার করে আছেন। বলা হয় থাকে তার সময়ে যত মন্দির, স্তুপ, সৌধ, প্রসাদ, ব্রীজ রাস্তা নির্মাণ বা দিঘী খনন করা হয়েছে তা অন্য সব রাজাদের সব কাজ একত্র করলে তুলনীয় হয়। জয়বর্মনের পরে আস্তে আস্তে খেমার রাজাদের গৌরবের সূর্য অস্তচলে নিষ্প্রভ হয়ে পড়তে থাকে এবং থাই রাজাদের দাপট বাড়তে থাকায় খেমার রাজারা পিছু হটতে শুরু করে। রাজধানী আংকর ত্যাগ করে নম পেনে গিয়ে স্থিত হবার চেষ্টা চালায়। আংকর খেমারদের রাজধানিী ছিল ১৪৩২ খৃষ্টাব্দে পর্যন্ত এর পরে আংকরের রাজনৈতিক গুরুত্ব কমে যায়, মন্দিরগুলি অবহেলায় জংগলে ঢাকা পড়ে এবং প্রধান কয়েকটি মন্দির ছাড়া বেশির ভাগ বিস্মৃতির অন্তরালে হারিয়ে যেতে থাকে যতদিন পর্যন্ত ফরাসীরা সার্ভে করতে গিয়ে পুনরূদ্ধার না করে।

প্রাচীন আংকর নগরীর অনেকগুলি স্থাপনাই নানা বিচারে বিশ্ব পরিচিতি  পাবার যোগ্য। সেজন্য লেখাটিকে দুই ভাগে ভাগ করা হল, প্রথম ভাগে আংকরভাট মন্দিরের এবং দ্বিতীয় ভাগে অন্যান্য স্থাপনাগুলির পরিচিতি তুলে ধরার ইচ্ছা রইল। আংকর নগরীর প্রত্যেকটি স্থাপনা নিয়েই এখনও প্রচুর গবেষণা চলছে, এত স্বল্প পরিসরে বিশদ বর্নণা দেয়া সম্ভব নয় এবং তার প্রয়োজনও দেখিনা, তাই পরিচিতিমুলক বর্ণনাতেই সীমাবদ্ধ রাখা হলো।

তথ্যকণিকা

  • নিকটবর্তী সিয়াম রিপ শহরে থেকে ৬ কিলোমিটার উত্তরে এবং আংকর থম এর ১ কিলোমিটার দক্ষিণে আংকর ভাটের অবস্থান। পশ্চিম দিক থেকে এর প্রবেশ পথ।
  • নির্মাণকাল: ১১৩০ খৃষ্টাব্দে।
  • নির্মাতা: রাজা সূর্যবর্মন ( রাজত্ব কাল ১১১৩ থেকে ১১৫০)।
  • স্থপতিঃ দিবাকর পন্ডিত ( যতদূর জানা যায়)।
  • ধর্মঃ হিন্দু বিষ্ণু মন্দির।
  • উচ্চতাঃ ৬৫ মিটার ( ২১৩ ফুট)।
  • আয়তনঃ ৫০০ একর জমির উপর বিস্তৃত

আংকর ভাট ( Angkor Wat )

প্রাচীন আংকর নগরীতে ঢুকতে গেলে প্রথমেই একটি  অর্থনৈতিক বাধার সম্মুখীন হতে হয়। এলাকাটি সংস্কার এবং সংরক্ষণের দায়িত্বে রয়েছে ইউনিসেফ, তাই যেমন কঠোর নিয়ম কানুন তেমনই প্রবেশ মূল্যও অত্যধীক, দশনার্থীর ছবি সহ একটা গেট পাশ দেয়া হবে, ওটা সব সময় সাথে থাকতে হবে, যে কোন সময়ে পরিদর্শকরা দেখতে চাইতে পারে, জনপ্রতি টিকেটের হার ২০ মার্কিন ডলার। এলাকাটি অনেক বড় তাই গাড়িসহ প্রবেশে বাধা নেই। ভিতরে ঢোকার পর কিছুটা এগুলোই চোখের সামনে উদ্ভাসিত হবে পৃথিবীর অন্যতম স্থাপত্য আংকর ভাট মন্দির। চারিপাশে পরিখা, তবে প্রতিরক্ষার জন্য যে তা খনন করা হয়নি তা মন্দিরের প্রাচীর দেখলেই বোঝা যায়।

হিন্দু মহাজাগতিক দর্শনে বিষ্ণু দেবতা পশ্চিমের অধীশ্বর,  তাই এই বিষ্ণু মন্দিরের প্রবেশ পথ পশ্চিম দিক থেকে। পশ্চিম থেকে পূর্ব প্রান্ত অক্ষ বরাবর ১৫০০ মি. এবং উত্তর থেকে দক্ষিণ অক্ষ ১৩০০ মি. মাপের এত বিশাল বিস্তৃত হিন্দু মন্দির আর একটিও আছে কি না সন্দেহ। আংকর ভাট মন্দিরটি তিনটি ধাপে ক্রমশ মাঝখানে উচু হয়ে উঠেছে, বিমান থেকে তোলা ছবি দেখলে বোঝা যাবে। মন্দিরের চারিপাশ ঘিরে ২০০ মিটার চওড়া পরিখা। আংকর নগরীতে অনেকগুলি জলাশয় এবং এগুলি খননের উদ্দেশ্য নিয়েও নানা গবেষণা চলছে। পরিখা থেকে ৪০ মিটার ভিতরে ৪.৫ মিটার উচু দেয়াল, চারপাশের  এই দেয়ালে দক্ষিণ, পূর্ব এবং উত্তর দিকে একটা করে প্রবেশ মুখ থাকলেও পশ্চিমে আছে ৫টি। পশ্চিম দিকে জলাশয়ের উপর দিয়ে একটা চওড়া ব্রীজ সরাসরি প্রধান প্রবেশ দ্বারে পৌছে দেয়। ব্রীজের দু পাশে রেলিং সুর অসুরের যৌথ উদ্যোগ সমুদ্র মন্থনের কাহিনী দিয়ে তৈরি। রেলিং এর আনুভুমিক দীর্ঘ পাথরটি আসলে মহানাগের ভাষ্কর্য, নাগ খেমার রাজবংশের প্রতীক। আংকর নগরীর অন্যান্য ভবনেও সমুদ্র মন্থন এবং নাগের সদর্প উপস্থিত। ব্রীজটা যথেষ্ট চওড়া, দু পাশের নাগ বা সাপ রেলিং বেশ চওড়া, ব্রীজের মাঝখানে একটা বিরতি, সেখান থেকে ধাপ দু পাশের পানিতে নেমে গেছে, রেলিং এর সাপ ঘুরে এসে জলাশয়ের দিকে মুখ করে বিশাল ফণা তুলে আছে, অবশ্য এখন ফণার পাথর অনেকাংশ কালের সংঘাত ভেঙে গেছে। সাপের ফনার সামনে সিংহমূতি, মাথা তুলে সতর্ক অবস্থায় দাঁড়িয়ে আছে। পশ্চিমের প্রবেশ মুখে কয়েকটি ধাপে উঠতে হয়, এই প্রবেশ মুখটির ছাদ দক্ষিণ ভারতের গোপুরার মত উঁচু এবং প্লানে যোগ চিহ্নের মত। সোজা গেলে বিশাল খোলা চত্বর পেরিয়ে মূল মন্দির আর ডানে এবং বামে করিডোর দিয়ে আরও কয়েকটি অপেক্ষাকৃত ছোট প্রবেশ মুখের সাথে সংযুক্ত। এই প্রবেশ তমুখের দু পাশে দুটি চেম্বারে সহদেবতাদের মূর্তি। পাশেল করিডোরগুলোর বাইরের দিকে কারুকার্যময় পাথরের গ্রীল, তার ফাক দিয়ে জলাশয়ের নয়নাভিরাম দৃশ্য। অন্যাপাশে বদ্ধ দেয়াল তাই করিডোর থেকে মন্দিরের ভেতরটা দেখা যায় না, তাই বলে হতাশ হবার কিছু নেই, দেয়ালের গায়ে যে রিলিফ ভাষ্কর্য আছে তা দেখতেই দশনার্থীর বেলা কেটে যেতে পারে। করিডোরের ছাদ ঢালু অনেকটা ভল্টের মত বাঁকানো, ছাদের উপর টালির সারির মত ডোকেরেশন, এও সেই সাপ অর্থ্যাৎ হাজার হাজার সাপ ছাদের উপরে পাশাপাশি শুয়ে আছে, দূর থেকে অবশ্য রেখা বলে মনে হয়। এই ধরনের ছাদ আমাদের দোচালা ছাউনির কথা মনে করিয়ে দেয়, এই ছাদের ব্যবহার সমগ্র আংকর নগরীর বিভিন্ন মন্দিরে ব্যাপক ভাবে করা হয়েছে। পাশের প্রবেশ মুখমন্ডলিতে পাশাপাশি চেম্বার আছে  সেখানেও ফুলের মালা আর পায়ের কাছে চন্দনের বাটি এবং ধুপধুনো নিয়ে পূজনীয় দেবতারা দাড়িয়ে আছেন, কাউকে কাউকে আবার গোরুয়া কাপড়ে আবৃত করা হয়েছে। আবার প্রধান প্রবেশ দ্বারে ফিরে যাই, ঢোকার মুখে দেবতা মূর্তি দৃষ্টি আড়াল করে দাড়িয়ে, মূর্তির পিছনে আরেকটি চেম্বার তারপর একটা প্যাভেলিয়ন, শেষ চেম্বার পার হতে গেটে দাঁড়ালেই হঠ্যাৎ চোখের সামনে বিশাল আংকর ভাট মন্দির উদ্ভাসিত হয়ে পড়ে। এই নাটকীয়তায়  যে কোন আগুন্তক অভিভুত হয়ে পড়বেন তাতে কোন সন্দেহ নাই। নীল আকাশের পটভূমিতে বহুচূড়ার এই মন্দির যে ভাবগম্ভীর মূর্তি নিয়ে প্রতভিাত তা সাধারণ মানুষের মনে এক আপেক্ষিক ক্ষুদ্রতা  এনে দেয়।

প্রবেশ দ্বারের থেকে সোজা মন্দির গেটে পৌছানোর জন্য শান বাধানো পথ, দু পাশে বিশাল সবুজ চত্বর। এই পথের দু পাশে দুটি লাইব্রেরী ছিল, ভগ্নদশা, এখন সংস্কার চলছে আরও ছিল দুটি ছোট পুকুর, মন্দিরে প্রবেশের আগে পবিত্র হয়ে নেবার জন্য হয়ত, এখন প্রায় ভরাট হয়ে এসেছে, পানি নেই, তারপর কয়েক ধাপে উচু একটা প্লাটফর্ম। এই পথের দু পাশেও সেই নাগ রেলিং এবং বিরতি। প্লাটফর্মের ব্যবহারিক  উদ্দেশ্য কি ছিল তা বোধগম্য না হলেও মূল মন্দিরে প্রবেশের পূর্বে একটা মানসিক প্রস্তুতি তৈরি হয়। হয়ত এখানে পুরোহিতরা জনসাধারণের উপস্থিতিতে কোন আচার অনুষ্ঠান করতেন।

মন্দির তিনটি ক্রমশ উচু এবং ছোট হয়ে আসা পর্যায়ে পরিকল্পিত। প্রতিটি পর্যায় বা স্তরের সীমানা কোন গ্যালারী বা প্রদক্ষিণ পথ দিয়ে আলাদা করা হয়েছে পান দেখলেই বোঝা যাবে। এর প্রথম পর্যায়েও একই রকম চেম্বার সহযোগে  প্রবেশ দ্বার। এবার কিন্তু প্রবেশ মুখের সাথে সংযোজিত হয়েছে একটা প্রদক্ষিণ পথ। সমগ্র মন্দিরটি ঘুরে আসা যায়, প্রদক্ষিণ পথের বাইরের দিকটা সারিবদ্ধ পিলার আর ভিতর দিক রিলিফ ভাষ্কর্য খচিত বদ্ধ দেয়াল।

রামায়ন, মহাভারত, খেমার রাজের যুদ্ধ জয়ের ইতিবৃত্ত এই রিলিফের প্রতিপাদ্য বিষয়। ভাষ্কর্যের ক্ষেত্রে ভারতে অনুসৃত তাল বা মাপ এখানে তঅনুপস্থিত হলেও চিত্রায়নে প্রভাব স্পষ্ট। একা কাহিনী থেকে অন্য কাহিনীতে প্রবেশ বা একস্তরের সাথে অন্য স্তরকে মেলানোর জন্য কম্পোজিশনের যে সব চাতুর্য ব্যবহৃত হয়েছে তা শিক্ষণীয়। ভারতের মন্দিরের ( কাজুরাহো, কোনার্কের সূর্য মন্দির) হাই রিলিফের বদলে সাধারণ গভীরতার রিলিফ হলেও বক্তব্য প্রকাশে এতটুকু কষ্ট হয়নি। ভারতীয় ভাষ্কর্যের মূলমন্ত্রে দীক্ষিত হয়েও দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ার ভাষ্কর্য এ সময়ে যে নতুন  মাত্রা অর্জন করেছিল তার প্রমাণ এই কাজগুলো। খুটিয়ে খুটিয়ে দেখতে গেলে এই প্রদক্ষিণ পথের মধ্যেই কয়েক বার বিশ্রাম প্রয়োজন হয়ে পড়ে। তিনটি পর্যায় বা স্তরের এই নীচের স্তরের প্রদক্ষিণ পথের চারটি কোণা এবং প্রত্যোক পাশের মাঝামাঝি একটা করে যে বিরতি তৈরি করা হয়েছে তার ছাদগুলি উচু ভল্টের মত যা প্রদক্ষিণ পথের কলাম সারিকে একটা ফ্রেমের আওতায় এনেছে। এই বিরতিগুলো সীমানা থেকে ধাপে ধাপে  একটু বেরিয়ে  এসে মন্দিরের দৃঢ় ভিত্তির আভাস দিচ্ছে। স্থাপতিক দৃষ্টিকোণ থেকে এর ভল্ট ছাদ এবং বেরিয়ে আসা কলাম সমৃদ্ধ প্যাভিলিয়রেন মত কম্পোজিশন খুবই প্রাসঙ্গিক। প্লান দেখলে বোঝা যায়, মন্দির বর্গাকৃুত নয় বরং উত্তর ও দক্ষিণ পাশ অপেক্ষাকৃত দীর্ঘ।

নীচের স্তরের পশ্চিমের সিংহদ্বারে আবার ফিরে আসি, প্রদক্ষিণ পথে না গিয়ে যদি সোজা ভিতরে ঢুকতে চাই, তাহলে সোজা একটা সিড়ি উপরে পরে স্তরে উঠে গেছে। ডান পাশে বুদ্ধ মূর্তির গ্যালারি ( হিন্দু, বৌদ্ধ মিলনের নির্দশণ) বা পাশে ফাকা হল, এখানে দেয়ালে কান পাতলে দূরের সুক্ষাতিসূক্ষ্ম শব্দ শোনা যায়, লক্ষ্মৗ নগরীর নবাবদের তৈরি ভুলভুলাইয়া বা গোলক ধাঁধার মত প্রাসাদেও দেয়ালের মধ্যে শব্দ সঞ্চালন পদ্ধতি প্রতিরক্ষার উদ্দেশ্যে ব্যবহৃত হয়েছে যা মানুষের বিষ্ময়ের উদ্রেক করে। এই পশ্চিম প্রান্তে দুই স্তরের মাঝখানের ফাকা জায়গায় দুই কোণে দুটি লাইব্রেরি কক্ষ আছে। মাঝখানের সিড়ি দিয়ে ২য় স্তরে উঠে এলে, ১০০ মি. × ১১৫ মি. মাপের চারদিকের ঘেরা প্রদক্ষিণ পথ। মাঝে মাঝে পাথরের গ্রীল দিয়ে আলো প্রবেশ করে। এখানে সাধারণের প্রবেশ নিষিদ্ধ ছিল, দেয়ালের উৎকীর্ণ ১৫০০ স্বর্গীয় অষ্পসা নানা নৃত্য ভঙ্গিমায় অবতীর্ণ, এরা সমুদ্র মন্থনের ফলে উঠে এসেছে। রাজা এবং পুরোহিতদের ধ্যান সাধনার জন্য এমন স্বর্গীয় সুখের আবহ খুবই প্রয়োজন। ২য় স্তর এবং সর্বোচ্চ ৩য় স্তরের মাঝখানে ফাকা জায়গায় দাড়ালে চোখে পড়বে পাহাড় প্রতীম ৩য় স্তরের চূড়াগুলো। যেখানে রাজা এবং পুরোহিতেরেই শুধু প্রবেশাধীকার সংরক্ষিত, যদিও বর্তমানে সকলের জন্য উন্মুক্ত। খাড়া পাথুরে সিড়ি বেয়ে উপরে ওঠা সহজ নয়।

৫০ মি. × ৫০ মি. উচু বর্গাকৃতি দাড়িয়ে আছে আংকর ভাট মন্দিরের ( Angkor Wat Temple )এই মূল কেন্দ্র। এখানে কোন গ্যালারি নেই, চার কোণে চারটি চূড়া এবং মাঝখানে সবচেয়ে উচু চূড়া। চারিপাশে করিডোর থেকে  বাইরের নয়নাভিরাম ক্রমাবনতীর দৃশ্য। এখানে উঠলে নীচের মানুষকে ছোট এবং নিজেকে দেবতাতুল্য বলে মনে হওয়াই স্বাভাবিক। মাঝখানের চূড়া ২য় স্তর থেকে ৪০ মি. উঁচু। ক্রশের উচ্চতম এবং বর্গাকৃতির এই ৩য় স্তর আবার যোগ চিহ্নের ত করিডোর দিয়ে চারিট বর্গক্ষেত্রে  বিভক্ত। বর্গক্ষেত্রের মাঝখানের উন্মুক্ত আকাশ। যোগ চিহ্নের কেন্দ্রের উপরে নির্মিত হয়েছে উচ্চতম চূড়া, নীচে মূল গর্ভগৃহ, বিষ্ণু মূর্তির অবস্থান। যতই উপরের দিকে উঠছে, ততই বাহ্যিক অলংকরণ কমছে, কিন্তু স্থাপতিক অনুষঙ্গ তার ধারাবাহিকতা বজায় রেখেছে। আংকর ভাট মন্দিরের মূল উপাদান বেলে পাথর তবে ভিত্তিমূলে পোড়া ইট ব্যবহৃত থাকতে পারে, এই পাথর ৩০ কি. মি. দূরে নম কুলেন পাহাড় থেকে সংগৃহীত, কাঠ  এবং তামা ব্যবহার হয়েছে, কাঠের অংশগুলি বর্তমানে বদলানো হয়েছে, কিছু কিছু জায়গায় আছে। স্টাকে প্লাষ্টারও কোন কোন জায়গায় করা হয়েছে। নির্মাণ উপাদানের উপযোগীতা, সহজ প্রাপ্যতার উপর নির্ভর করেই সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে, উপাদানকে প্রর্দশণীর আয়োজন নেই।

আংকর ভাট ( Angkor Wat ) পরিকল্পনায় আংকর হিসাব

গবেষকরা বলেছেন আংকর ভাট মন্দির গ্রহ নক্ষত্রের অবস্থানের গাণিতিক হিসাবের ভিত্তিতে পরিকল্পিত হয়েছে। কোন একটা মাপের গুণিতকে সবকিছু  নির্ধারিত হয়েছে, তখনকার দিনে হাতের দৈর্ঘ্য ব্যবহৃত হত, তাহলে কোন নির্দিষ্ট হাতের দৈর্ঘ্য হতে হবে, অনেক গবেষণার পর দেখা গেছে সেই মাপের এককটি . ৪৩৫৪৫ মিটারের সমান যা রাজা দ্বিতীয় সূর্যবর্মনের হাতের দৈর্ঘ্য। এক হাতকে বলা হয় Cubit, এমনই চারহাত সমান দৈর্ঘ্যক খেমার ভাষায় ফিয়াম, এই অক্ষ দুটি পশ্চিম থেকে পূর্ব এবং দক্ষিণ থেকে উত্তরে প্রলম্বিত।

হিন্দু মহাজাগতিক দর্শনের হিসাবে কাল ( সময়) চারটি যুগে বিভক্ত। যেমন- কৃত ( সত্যযুগ), ক্রেতা, দ্বাপর এবং কলি। আমার কলি ‍যুগের মানুষ। এই যুগ শেষ হবার উপায় নেই, তা আবার চক্রাকারে ফেরত আসে। বছরের হিসাব দুই রকম, পৃথিবীর বছর আর স্বর্গীয় বছর। চার যুগের একবার আবর্তনে একটা মহাযুগ। ১৪টি মহা ‍যুগ এবং ১৫ টি কৃত যুগের যোগফল হলো এক কল্প যুগ ( ৪,৩২,০০০,০০০ পৃথিবীর বছর)। ৭২০ কল্পে ব্রম্মার এক বছর, এমনি ১০০ বছর যখন ব্রম্মার বয়স হবে তখন সবকিছু শেষ হয়ে গিয়ে ঘুমন্ত ব্রম্মার সাথে মিলিত হয়ে বিলীন হয়ে যাবে।

এই চার যুগকে গাণিতিক হিসাবে প্রতিফলিত করা হয়েছে পশ্চিম থেকে পূর্বের অক্ষে প্রতি ১০০০ পৃথিবী বর্ষকে ১ হাত বা .৪৩৫৪৫ মি. হিসাবে। লক্ষণীয় অপব্রিত কলি যুগের মানুষ পশ্চিম দিক থেকে ঢুকছে, তাই কলি যুগকে ব্রীজের মধ্যেই অর্থ্যাৎ বর্হিদেয়ালের বাইরেই রাখা হয়েছে। তেমনি উত্তর দক্ষিণেল অক্ষকেও ভাগ করা হয়েছে, তবে অন্য হিসাবে যেহেতু মানুষ ঐ দিক দি  প্রবেশ করবে না। মন্দিরের ক্রম স্তরগুলিতে এই কালের হিসাবের সাথে সামঞ্জস্য রেখেই স্থাপতিক উপাদান যেমন- প্রদক্ষিণ পথ, বিরতি, রিলিফ ভাষ্কর্যের মাপ এবং বিষয়বস্তু নির্ধারিত। সমগ্র মন্দির পরিকল্পনায় এমন কিছুই নেই যা ঐ মডিউলের হিসাবের  বাইরে। কোন উপাদানের মাপ কেন ঐ মাপের হয়েছে তার গাণিতিক যুক্তিও রয়েছে। স্থাপত্যে অংকের এবং দর্শনের এমন সমন্বয় পৃথিবীর আর কোন ইমারত হয়েছে কিনা জানা নেই।

পশ্চিম গ্যালারি

১) কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধ (মহাভারত)

১১) লংকার যুদ্ধ ( রামায়ন)

দক্ষিণ পশ্চিম কোণেল গ্যালারি

২) রামায়ন কাহিনী

দক্ষিণ গ্যালারী

৩) রাজা ২য় সুর্যবকর্মনের যুদ্ধ জয়ের উপাখ্যান

৪) যমের বিচার এবং স্বর্গ ও নরকের দৃশ্য

পূর্ব গ্যালারি

৫) সমুদ্র মন্থন

৬) বাণী এবং উপদেশ

৭) বিষ্ণুর দুষ্ট দমন কাহিনী

উত্তর গ্যালারী

৮) কৃষ্ণের যুদ্ধ জয়

৯) দেবতা এবং অসুরদের যুদ্ধ

উত্তর পশ্চিম কোণের গ্যালারি

১০) রামায়ন কাহিনী

আংকর ভাটের ভাষ্কর্য  – Angkor Wat Sculpture

ভারতের হিন্দু মন্দিরগুলির মত বেলে পাথর কেটে খোদাই করা ভাষ্কর্যের প্রাচুর্যে আংকর ভাটকে বিশাল আর্ট গ্যালারী বললে অত্যুক্তি হয় না।  এই খোদাই কাজকে মোটামুটি দুই ভাগে ভাগ করা যায়, এক, বিল্ডিং অলংকরণ দুই, রিলিফ এবং দেবমূর্তি। অলংকরণের প্রাচুর্য থাকলেও তা স্থাপত্য উপাদানের সহযোগী হিসাবেই এসেছে, কখনোই স্থাপত্যকে অতিক্রম করেনি। এখানে বার বার নাগ, রিং, ফুল, লতা পাতা, নৃত্যরতা অস্পরী ব্যবহৃত হয়েছে। করিডোরের ঢালু বাকানো ছাদ, কার্নিস, কলাম, করিডোরের গ্রীল, জানালা দরজার ফ্রেম সর্বত্রই অলংকরণ। এসব খোদাই কাজে জ্যামিতিক সীমা রেখার মধ্যে থেকেই ইচ্ছামত প্রাকৃতিক বিষয়াদী গ্রহণ করা হয়েছে, তবে কোন কিছুই অপ্রাসঙ্গীক মনে হয় না। পৌরাণিক কাহিনী বর্ণনার জন্য করিডোরের দেয়াল রিলিফ ভাষ্কর্যে উৎকীর্ণ করা হয়েছে। বিষয়বস্তুর কাহিনী, মন্দির স্থাপত্যে ব্যবহৃত কালানুক্রমিক স্তরে বিভিন্ন, যেমন প্রথম স্তরে দেবরাজা সূর্যবর্মনের নানা যুদ্ধ জয়ের চিত্র আবার দ্বিতীয় স্তরে, স্বর্গীয় অষ্পসরাদের নৃত্যকলা। বিষ্ণু দেবতার নানা অবতার কাহিনীও প্রথম স্তরে কারণ তা মর্তের সাথে সংশ্লিষ্ট। এসব রিলিফ প্যানেলের মাপ, রিলিফে প্রকাশিত সুর বা অসুরের সংখ্যা স্থাপত্যে গাণিতিক হিসাবের সাথে সম্পৃক্ত।

সামগ্রিক স্থাপত্য বিচার

আংকর ভাটের রিলিফ ভাষ্কর্য এতই আর্কষনীয় যে, ভাষ্কর্য না স্থাপত্য কোনটি বেশি গুরুত্বপূর্ণ তা নিয়ে সংশয় জাগে। তবে সম্পূর্ণ মন্দিরটি ঘুরে দেখলে এর স্থাপত্য শৈলি যে অন্যান্যে  যে কোন বিষয়কে ছাড়িয়ে অনেক উপরে অবস্থান করছে সে সম্বন্ধে আর সন্দেহ থাকে না।

গাণিতিক হিসাবের কথা না ধরলেও,  এর প্রতিটি ত্রিমাত্রিকক পারসরের মান এতই যথার্থ  সে সকল মাত্রায়ই তা বিশ্বমানের স্বীকৃতি পাবে। স্পেসের গতিময়তা, নাটকীয়তা, আলো ছায়া সবই সুনিশ্চিত। পর্যায় ক্রমিক স্তরের মাঝখানে ক্রমশ ছোট হয়ে আসা উন্মুক্ত উঠোনগুলি তার চারপাশের বিল্ডিং এর সাথে সংগতি রেখেই তৈরি হয়েছে। মন্দিরের চূড়াগুলি শিখর কাল্পনিক ভাবে যোগ করলে পিরামিডের মত হয়ে যায়। অর্থ্যাৎ মাঝখানের শিখর থেকে অন্যান্য শিখরগুলি ক্রমশ নির্দিষ্ট মাপে নেমে   এসেছে যা থিওডোলাইট দিয়ে দেখলে প্রায় একটা লাইনের সূত্রপাত ঘটায়, এখানেও গ্রহ নক্ষত্রের হিসাব আছে, প্রতিটি চূড়া, প্রতিটি গেট অক্ষ রেখার সাথে মিলিয়ে মহাকাশেল নির্দিষ্ট নক্ষত্রের প্রতীক। হিন্দু শাস্ত্র মতে মহাজগতের কেন্দ্র হল ‘মেরু’ পর্বত, আংকর ভাট মন্দিরের কেন্দ্রীয় শীর্ষ চূড়া মেরু পর্বতের প্রতীক এবং অন্যান্য ৪ টি চূড়া ঐ  পর্বতামালারই নানা শৃঙ্গ, বাইরের সীমানা এবং চারিদিকের জলধার মহাসাগরের প্রতীক। গ্রহ নক্ষত্রের অবস্থান পরিবর্তনের হিসাবের সাথে সামঞ্জস্য রেখে মন্দিরের বিভিন্ন অংশের দুরুত্ব   এবং অক্ষ নিরূপিত হয়েছে। পূর্ব পশ্চিমের অক্ষে বছরের একটা নির্দিষ্ট দিনে সূর্য অবস্থান করে, নিচের ছবিটি তার প্রমাণ।

ছবিটি আংকর ভাটের উত্তর দিকের প্রথম সিড়িটির শীর্ষ থেকে তোলা হয়েছিল। সময়টি ছিল ২১ শে মার্চ, ১৯৯২। তৎকালীন জোতির্বিদদের মতে বছরের এই সময়টিতে সূর্যকে আংকর ভাটের ( Angkor Wat ) প্রধান অক্ষরেখা বরাবর মাঝখানের সবচেয়ে বড় চূড়ার ঠিক শীর্ষে দেখা যায়।

  • আগামীতে আংকর নগরীর অন্যান্য প্রধান ইমারতের বর্ণণা ছাপা হবে।
  • ব্যবহৃত ছবি এবং ড্রইং বিভিন্ন বই এবং লেখকের নিজের তোলা  ছবি থেকে গ্রহণ করা হয়েছে।

ভারতবর্ষ থেকে আগত হিন্দু ধর্মের মন্দিরে ভারতীয় স্থাপত্য ও ভাষ্কর্যের প্রভাব থাকাটাই সমীচীন। কিন্তু খেমার স্থাপত্যকলা সেই প্রভাব বলয় ছাড়িয়ে নিজস্ব ধারা সৃষ্টি করেছিল এবং বহুদূর এগিয়ে স্বমহিমায় প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল তার জ্বাজ্জল্য প্রমাণ আংকর ভাট এবং আংকারের অন্যান্য স্থাপনাগুলি। খেমার রাজত্বের অবসানের পরে বহুযুগ বনজংগলে আবৃত হয়ে থাকায় বেশিরভাগ ভবনের অনেকাংশ কালের সংঘাতে বিলীণ হয়ে যাচ্ছিল। আধুনিক সচেতন বিশ্বের সহায়তায়, নবতর প্রযুক্তিতে এসব ভবন সংরক্ষণ চলছে। আংকর ভাট নিয়ে নিত্য নতুন গবেষণা চলছে,  এসব গবেষণার পুরোধা পশ্চিমা গবেষকরা। সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের যোগসূত্র, ঐতিহাসিক পটভুমি এবং খেমারদের প্রযুক্তির শিক্ষার ভিত্তি খোঁজার  তাগীদ তাদের নেই, একাজ এশিয়ার  মানুষকেই করতে হবে। যত দ্রুত তারা একাজে নামবেন ততই মঙ্গল।


দুদন্ড ধানমন্ডিতে

Category : ভ্রমণ

দুদন্ড ধানমন্ডিতে

 

মাথার উপরে সদ্য ফোটা লাল কৃষ্ণচুড়ার বাহারি পসরা, ডালে ডালে পাখির কলকাকলি আর হালকা দক্ষিণা বাতাস, সব মিলিয়ে এক প্রাণ চুড়ানো মনোরম আবহ। ইট-কাঠের এই কৃত্রিম নগরের প্রাণ কেন্দ্রে এ রকমই এক টুকরো  মোহময়ী  পরিবেশ নিয়ে স্বগর্বে  নিজেকে জানান দিচ্ছে ধানমন্ডি লেক।  নগরীর ঐতিহ্যেরও একটি অংশ এই লেক। দীর্ঘ লেক, লেকের পাড়ে পার্কের আদলে  বিস্তৃত খোলা জায়গা, বাহারি আর দৃষ্টি নন্দন  নানা প্রজাতির বৃক্ষ, লেকের পানির ওপরে মাথার ওপরে ছাদ দেয়া  বসার স্থান সব মিলে এক কথায় অসাধারণ পরিবেশ। আর এমন চমৎকার পরিবেশ তো মানুষকে টানবে এটাই স্বাভাবিক।  বিশেষ করে ১৯৯৫ সালে সংস্কার কার্যক্রম  এর পর এর আকর্ষণ কয়েকগুণ বেড়েছে মানুষের কাছে।  আর তাই তো প্রতিদিন অসংখ্য মানুষের আগমনে মুখরিত হয় ধানমন্ডি লেক।  তাদের বিশিরভাগই আসে কাজের ফাকে বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা দিতে, কেউবা আবার অবসরে। নানান পেশার, নানান বয়সের  মানুষ প্রতিদিন  আড্ডা  দেয় ধানমন্ডি লেকের বিভিন্ন স্পটে।  তবে তাদের  মধ্যে তরুন-তরুণীদের উপস্থিতি চোখে পরে বেশি।  সকাল থেকেই চলে আড্ডা বাজি।  তবে দুপুর গড়িয়ে  বিকেল নামতেই  সেটা বেড়ে যায়  বহুগুণে।  কেউ ভার্সিটির ক্লাস শেষ করে , কেউ বিকেলের অবসরে  আবার কেউবা অফিস থেকে বের হয়ে  বাসায় যাওয়ার  আগে চুটিয়ে আড্ডা মারে এখানে।

ধানমন্ডি ৩২ নম্বরের  ব্রিজ পার হয়ে লেকে ঢোকার মুখে ডান দিকে লেকের পাড় ঘেঁসে আড্ডা দিচ্ছিল তেমনই  একদল তরুণ-তরুণী। উদ্দেশ্য খুলে বলা মাত্র তারাও সাদরে আমন্ত্রণ জানাল তাদের আড্ডায় যোগ দেয়ার জন্য।  সবাই বেশ প্রণবন্ত আর আন্তরিক আড্ডায়। ঢাকা  বিশ্ববিদ্যালয় এর আলাদা তিনটি বিভাগের শিক্ষার্থী সবাই।  তবে কলেজ জীবনে একই সঙ্গে পড়া এবং সবার বাসা ধানমন্ডি এলাকায় হওয়ায়  এখানে  আড্ডা দেয়া তাদের রুটিন হয়ে গেছে।  স্বাভাবিক ভাবেই তাদের কাছে প্রশ্ন, আড্ডা  দিতে ধানমন্ডি লেকে কেন ? ঢাবির সমাজ বিজ্ঞান বিভাগের  ছাত্র নবীন বলেন ‘দেখতেই পাচ্ছেন কী সুন্দর পরিবেশ। নির্ঝাঞ্জাট খোলামেলা জায়গায় আড্ডা দিতে কার না ভাল লাগে বলুন। সারাদিন তো পিসি আর ফেসবুক নিয়ে পড়ে থাকি।  এর ফাঁকে বন্ধুদের সেঙ্গে আড্ডাটা যদি এমন সুন্দুর জায়গায় হয় তো মন্দ কী!

 

লামিয়া বলেন, আসলে আমরা এই এলাকার বাসিন্দা সেটাও একটা কারণ।  তারপরও ধানমন্ডি লেক কিন্তু  অসাধারণ স্থান আড্ডা দেয়ার জন্য।  লামিয়ার মৃদু প্রতিবাদ করে হিমেল – এই এলাকার  সেটাই আসল কথা নয়, আপনি দেখবেন অনেক দূর থেকেও  মানুষ আড্ডা দিতে  আসে এখানে।  আসলে জায়গাটা  সুন্দর তাই সবাই আসে। আড্ডার স্থান হিসেবে এটা কেমন ? এ প্রশ্নে সবাই একযোগে বলে ওঠে ‘অসাধারণ” ।  নবীন আবার বলে, অবশ্য মাঝে মাঝে বিশেষ করে ছুটির দিনে দর্শনীয়দের আগমন এত বেশী হয় যে, নিরিবিলি আড্ডা দেয়ার সুযোগ নেই। তবে তাতে তো করার কিছু নেই, সবার ভালো লাগে তাই আসে। সামির বলে, ছুটির দিনের ভিড়টাও আবার আরেকদিক দিয়ে উপভোগ্য হয়, অসংখ্য মানুষ আসে।  এক কথায় জমজমাট পরিবেশ।  আর কী থাকে আপনাদের আড্ডায় এমন প্রশ্নে সব তরুণের মতোই তাদেরও সচকিত জবাব- আমাদের আড্ডায় কী থাকে সেটা নয়, বলুন কী নেই ? খুররাম বলেন, জগতের সব পাবেন এখানে। কোনো নির্দিষ্ট টপিক নেই, যা মনে আসে তাই বলি।  গল্প করি, বাদাম-আইক্রিম-ফেরিওয়ালার চা ইত্যাদি যখন যেটা পাই খাই।  এভাবেই সময় কেটে যায়।

 

উদ্যানের মাঝখানে সবুজ খাসের ওপর গোল হয়ে  বসে কাগজ-কলম নিয়ে কাজ করছে একদল তরুণ-তরুণী। কাছাকাছি যেতেই উৎসুক দৃষ্টিতে চাইল দু একজন। উদ্দেশ্য বলার পর তরুণদের মধ্যমণি নিলয় বলেন, অ্যাসাইনমেন্ট করছি ভাই, এই ঝামেলা শেষ হলে আড্ডা দেব।  ধানমন্ডির একটি নামকরা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী তারা।  বললেন,  ’এখন যদিও ক্লাসের কাজ করছি, তবে আমরা নিয়মিত আড্ডা দেই। ক্লাসের  ফাঁকে সুযোগ পেলেই ছুটে আসি বন্ধুরা মিলে। কোনো রুটিন নেই, কোনো ধরাবাধা নিয়ম নেই। সময় পেলেই ছুটে আসি আড্ডা মারতে। এসবের  মতো আরও শত শত মানুষ প্রতিদিন আড্ডা  দিতে আসে ধানমন্ডি লেকে। স্কুল থেকে ভার্সিটি পর্যন্ত সব  বয়সের ছাত্ররা আড্ডা দেন কিছু পঞ্চাশোর্ধ্ব মানুষ, আশপাশের কোচিং সেন্টারগুলোর ছাত্র / ছাত্রীর অভিভাবকরা তাদের অপেক্ষার সময়টুকু কাটায় নিজেদের মধ্যে আড্ডা দিয়ে।  মনের মানুষের সঙ্গে সময় কাটাতে ও কেউ কেউ বেছে নেয় এই সুন্দুর জায়টিকে।

 

পাঁচ নম্বর ব্রিজের কাছে এক চা বিক্রেতাকে ঘিরে জটলা করে আছে কয়েকজন।  সবাব হাতে অফিস ব্যাগ।  আলাপ  করে জানা গের তারা একটি বাজারতাজকারী প্রতিষ্ঠানের কর্মী।  কজ শেষে  বাসায় ফেরার ফথে তাদের ভাষায় একটু হাওয়া খেতে এসেছেন লেকে। কাছাকাছি অফিস, তাই প্রতিদিন  অফিস শেষ করার পর কিছু সময় লেকে আড্ডা দিয়ে তারপর ঘরমুখো হন তারা।  তাদেরই একজন হালিম শেখ বলেন, সারাদিন  কাজের চাপে দম ফেলার সময় পাই না। তাই কাজ শেষে  একটু রিলাক্সড হয়ে বাসায় যাই।  আবার তো কাল সকালে উঠেই দৌড় শুরু হবে। বলতে বলতে হেসে ওঠেন তিনি।  হালিম শেখ  আর তার সহকর্মীরা যখন ফেরিওয়ালার  কেটলির চা শেষ করছিলেন, সেময় কলা বাগান ক্লাবের কাছের ব্রিজের ঢাল থেকে ভেসে আসেতে থাকে গিটারের টুংটাং শব্দ।  ড্যাফোডিল ইনস্টিটিউট অব ইনফরমেশন অ্যান্ড টেকনোলজির একদল ছাত্র সেখানে জমিয়ে তুলেছে চারদিকের পরিবেশ। কাছে গিয়ে দেখা গেল একজনের হাতে গিটার, সবাই মিলে গাইছে গলা ছেড়ে।  শৌখিন  শখের  গিটার বাদক, আড্ডার সময় নিজের অল্পবিস্তর সংগীত প্রতিভা শেয়ার করেন বন্ধুদের সঙ্গে।  বন্ধুরা কেউ গানের শিল্পী না হলেও শৌখিন যখন গিটারের ঝঙ্কার তোলেন তখন কেউ আর চুপ থাকতে পারেন না।সরাসরি প্রশ্ন তাদের কাছে – আড্ডা দিতে লেকে কেন ?  পাল্টা প্রশ্ন করে তন্ময়- কোথায় যাব তাহেলে বলেন?  ভার্সিটি শেষে একটু আড্ডা মারি এখানে। সুন্দর  নিরিবিলি জায়গা। এর মতো আর কোথাও আছে নাকি ? তন্ময়ের মতো দলের আর সবারও একই মত।  সবাই একবাক্যে স্বীকার করে আড্ডার স্থান হিসেবে ধানমন্ডি লেক অনন্য।  তাই আর সবার মতো তারাও নিয়মিতই আড্ডা দেন এখানে।

 

এমনিভাবে যারাই আসেন লেকে আড্ডা দিতে, সবাই একটা জায়গায় একমত, এমন মনোরম পরিবেশ আর হয় না আড্ডার জন্য।  প্রাণ খুলে বন্ধুদের সঙ্গে মনের মতো সময় কাটানোর যে মানুষের সহজাত প্রবণতা তাকে পরিপূর্ণতা দিতেই যেন আড্ডার সব সহায়ক উপকরণ নিয়ে উপস্থিত ধানমন্ডি লেক।  আর তরুণরাও যে তা লুফে নিতে এক মুহুর্তও দেরি করতে রাজি নয়।  তাই তো প্রতিনিয়তই চলে আড্ডাবাজি, বাজে তারুণ্যের জয়ধ্বনি।

 


ইউরোপের ককপিটে

Category : ভ্রমণ

ইউরোপের ককপিটে

 

এ অঞ্চলে হ্রদ, বাগান ও বনের অপূর্ব সম্মিলন, পাখির ডাক ও পাতার মর্মর-ধ্বনি আবিষ্ট করে রাখে রাত দশ টা পর্যন্ত, আর তখনই বেলাটি ডোবে, এর আগে নয়।

 

২০০৯ সালের ২৬ মে সারাদিন আবুধাবি বিমানবন্দরে ঘুরেফিরে খেয়েদেয়ে নাদুসনুদুস হয়ে পরদিন ব্রাসেলস বিমানবন্দরের  নেমেই একটা ধাক্কা খাই। ইমিগ্রেশন  কর্মকর্তা আমাকে জিজ্ঞেস করে, কোন উপলেক্ষে এসেছো? বলি বৈজ্ঞানিক সফরে, ল্যাবরেটরি ভিজিট।  তরুণ কর্মকর্তা তাৎক্ষণিক জিজ্ঞেস করে, বলো তো ‘HACCP’ বলতে কি বোঝোয় ? উত্তর দেই, জানি না। তাহলে ল্যাব ভিজিটে কী করে এলে ?  আবার বলি, আমি বিজ্ঞানী নই, মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তা হিসেবে দলে অর্ন্তুভুক্ত হয়েছে, এমন আরো আছে।  সো আমার দিকে তাকিয়ে হাসি-কান্নার মাঝামাঝি অভিব্যাক্তি নিয়ে পাসপোর্ট এ ইমিগ্রেশনের সিলটা সেঁটে দেয়।  আমি ভেতরে ঢুকে কিছুটা অস্বস্তির অনুভুতি নিয়ে ড. মমতাজ দৌলাতানাকে জিজ্ঞেস করলে তিনি বলেন, এর অর্থ Hzard, Analysis Critcal Control Point. বলি, আগে যে কেন  আমাকে পড়িয়ে আনলেন না।

 

বেলজিয়ামকে বলা হয় ইউরোপের ককপিট। কারণ বেলজিয়ামে যুদ্ধক্ষেত্রের  সংখ্যা সবচেয়ে বেশি।  যেমন- Oudenarde, Ramilies, Fortenoy, Fleurus, Jemmapes, Ligny, Quarter Bar, Waterloo ইত্যাদি।  এক সময় বেলজিয়াম থেকে ইউরোপ এর যে কোন দেশে সহজে গমনাগমন সম্ভব ছিল।  তখন ফ্রান্স থেকে জার্মানি আক্রমণ এবং জার্মানি থেকে ফ্রান্স কিংবা স্পেন থেকে নেদারল্যান্ডস আক্রমণে বেলজিয়াম এর মাটি ব্যবহৃত হতো।  ১৮৩০ – ৩৯ খ্রিষ্টাব্দের বেলজিয়াম বিল্পব আরো দুটি আধুনিক রাষ্ট্রের জন্ম দেয়। নেদারল্যান্ড ও লুক্সেমবার্গ।  তিন প্রতিবেশি একত্রে মিলে হয় Benelux. তাই আগে ভাগেই ভেবে নেই ককপিটে বসে বেনেলাক্সের পুরোটাই ভ্রমণ করব কিংবা যাব ফ্রান্স  অথবা অন্য কোথাও।

 

বেলজিয়ামের Federal Agency for the Safety of the Food Chain- এর প্রতিনিধি মিস ওরিয়ে ক্রিস্টিন বিমানবন্দরে আমাদের অভ্যার্থনা জানান।  এদিন বিকালে  ‘Grand Place’ দর্শনপূর্বক ব্রাসেলস শহরে একটা চক্কর দিয়ে চলে আসি হোটেল La Vignett এর  এটি উপশহর টারভুরেনে অবস্থিত।  এখনকার একটি জঙ্গলের ভেতর Food Chain এজেন্সির  ল্যাবটি স্থাপিত।  স্থানটি অতি চমৎকার। রবার্ট ফ্রস্টের কবিতা আমাকে অচ্ছন্ন করে রাখে: কাজল গভীর এ বন মধুর লাগে, কিন্তু আমার ঢের কাজ বাকী আছে, যেতে হবে দূরে ঘমিয়ে পড়ার আগে।  কত দূর যাব জানি না, তবে ফ্রান্স আর নেদারল্যান্ডস তো অবশ্যই।  এই বন-জঙ্গলের মধ্যে হয়েছে আবার বৃষ্টি।  তাই সন্ধ্যায় সব ঠান্ডায় জমে যাচ্ছি। ভাগ্যিস একটা পাতলা সোয়েটারে এনেছিলাম। মে মাস বিধায় অন্যেরা কেউ কিছু নেয়নি। সন্ধ্যায় বাংলাদেশ দূতাবাসের কর্মকর্তা, আত্মীয় রফিকুল ইসলাম সস্ত্রীক চলে আসেন সাক্ষাৎ করতে।  জনালেন, গতকালই তাপমাত্রা উনত্রিশ ডিগ্রি ছিল, আজ হয়তো ছয়-সাত। বেলজিকরাই তাই বলে থাকে, আবহাওয়া আর আমাদের নারীর মন বোঝা ভার।  এবার রফিকের স্ত্রীকে একটু হাসতে দেখি।

 

পরদিন প্রতুষ্যে পাখির ডাকে ঘুম ভাঙ্গে।  পাখ-পাখির  এতটা ডাকবে আগে ভাবিনি। এ অঞ্চলে হ্রদ, বাগান ও বনের অপূর্ব সম্মিলন, পাখির ডাক ও পাতার মর্মর ধ্বনি অবিষ্ট করে রাখে  রাত দশটা পর্যন্ত, আর তখনই বেলাটি ডোবে, এর আগে নয়। মেঘ কেটে দিয়ে রোদ উঠলে বেলজিকরা এখানে –সেখানে বসে আড্ডা দেয়, কিছুটা হৈ-হুল্লোর করে।  আজ উল্লেখযোগ্য স্থাপনা হিসেবে পরিবদর্শন করি আফ্রিকান জাদুঘর। ভেতর ছাড়াও বাইরের পরিবেশ অতি চমৎকার।  এর চত্বরে রয়েছে কাষ্ঠনির্মিত অনেক হস্তমূর্তি। আর তাদের ইতিহাসের সাক্ষী বিভিন্ন নরগোষ্ঠীর নির্দশন। ভেতরে প্রচুর অ্যানটিকের উপস্থিতি, যেন এক টুকরো আফ্রিকা।

 

বেলজিয়াম পুরো দেশটাই ইতিহাসের নানা ঘটনার  সাক্ষী। ইতিহাস এর বিভিন্ন পর্যায়ে  প্রচুর জাতিগত ও ভাষিক মিশ্রণ ঘটেছে। এখানকার ওলন্দাজ ভাষিকদের বলা হয় Flemish (Flanders), আবার ফরাসি ভাষীদের Walloons (Wallonia) ছেলেবেলায় প্রায়ই একটি প্রশ্নের সম্মুখীন হতাম: পথিবীর সবচেয়ে  মজবুত ও মানসম্পন্ন কাচ কোন দেশে উৎপন্ন হয় ?  বলাবাহুল্য সেটি বেলজিয়াম।  এখন কাচের স্থান দখল করেছে চকোলেট।  তবে পুজিবাদী বিশ্বে বেলজিয়াম এর খ্যাতির অন্ত নেই। ইউরোপীয়  দেশগুলোর ঐক্যের অন্যতম নেতা এ দেশটি, যেখানে অবস্থিত ন্যাটোর সদর দপ্তর।  ইউরোপীয় ইউনিয়নের রাজধানী এ বেলজিয়ামে ইউরোপীয় পার্লামেন্টেও অবস্থিত। উল্লেখ্য, ইউরোপ ক’বছর  আগেই চালু করেছে তার নিজস্ব মুদ্রা  ইউরো, যা এখন বিশ্বের মুদ্রাবাজারের অন্যতম নিয়ামক শক্তি। ইউরোপের এ সাফল্য বেলজিয়ামেরই জয়জয়কার ঘোষণা করছে।

 

তবে আমরা এখন সাফল্যের দিকে না তাকিয়ে আপাতত তাকাই ইতিহাসের দিকে।  স্থির হয় আগামী ত্রিশ মে যাব ওয়াটারলু। সকালে রফিকুল ইসলাম আসেন দূতাবাসের চালক দেলোয়ারকে  নিয়ে।  সঙ্গে তার নিজের  যানটিও। গিয়ে দেখি নেপোলিয়ানের যুদ্ধক্ষেত্র এখন ফসলের জমি,  তথায় নানা ফসলের চাষ হয়েছে। ট্যুরিস্ট বাসে মাঝেমধ্যেই ঘটনাকেন্দ্রিক বর্ণনা ও শব্দ বেজে উঠছে, যেমন:  অশ্বখুরধ্বনি, তলোয়ারের ঝনঝনানি ইত্যাদি। প্রথম ফরাসি সম্রাট নেপোলিয়ান বোনাপার্ট ও সাত মিত্রশক্তির ( যুক্তরাজ্য, প্রুশিয়া, অস্ট্রিয়া, এবং অন্যান্য) মধ্যে ওয়াটারলুর যুদ্ধ সংঘটিত হয়েছিল ১৮১৫ খ্র্রিষ্টাব্দ এর ১৮ জুন।  সপ্ত-মিত্রের দুই অধিনায়ক ছিলেন Duke of Wellington   এবং General Von. ওয়াটারলু ছিল  একটি কৌশলগত স্থান, যেখান থেকে মিত্রশক্তির দ্বারা নেপোলিয়নের বেলজিয়ামে অনুপ্রবেশ ঠেকানো সম্ভব ছিল। ওয়াটারলুতে  পাহাড়ের ওপর ফ্রান্সের  দিকে মুখ করে একটি সিংহমূর্তি স্থাপিত হয়েছে, নাম La Butte du Lion. ২২৬ টি সিঁড়ি অতিক্রম করে ওখানে উঠতে হয়।  অন্যান্য আকর্ষণীয় স্থান হচ্ছে ওয়েলিংটন জাদুঘর এবং সেন্ট যোসেফের রোমান ক্যাথলিক চার্চ, যেখানে ওয়েলিংটন যুদ্ধযাত্রার আগে প্রার্থনা করছিলেন।  এ স্থাপনায় ব্রিটিশ এবং ওলন্দাজদের স্মৃতিচিহ্নও দৃশ্যমান।

 

এবার আমাদের আস্তানা ব্রাসেলসের  হোটেল ব্লু ম দুপুরের পর বাঙ্গালি ভাইদের সহায়তায়ই রওনা দিই Atomium অভিমুখে।  এটোমিয়ামের স্থাপত্যশৈলী অপূর্ব।  Atomium ১০৩ মিটার  উচ্চাতার এক প্রতিকী কাঠামো, যা ১৯৫৮ খ্রিষ্টাব্দের ব্রাসেলস বিশ্বমেলা উপলক্ষে স্থাপিত হয়।  স্থানটির নাম হিজেল।  স্থাপনাটির ডিজাইনার প্রকৌশলী মোজার্ট, আর স্থাপতিদ্বয় আঁন্দে ও জাঁ পোলাক। ভবনটির উচ্চতা ১০২ দুই মিটার।  এর ৯টি ১৮ মিটার (৫৯ ফুট) ব্যাসযুক্ত স্টেইনলেস স্টিলের গোলক এমনভাবে টিউব দ্বারা সংযুক্ত হয়েছে যাতে প্রতিটি স্বচ্ছ গোলক এক বিলিয়ন গুণ বড় হয়ে প্রদর্শিত হতে পারে।  এতে এস্কেলেটর ও লিফট এর সংযোগ রয়েছে, যেন নয় গোলক এর পাঁচটি বিচরণযোগ্য গোলকে দর্শনার্থীরা আরোহণ করতে পারে।  এসবে আছে Expo hall,  প্রদর্শনী হল ইত্যাদি।  শীর্ষ গোলকটি থেকে পর্যটকরা পেতে পারেন ব্রাসেলস শহরের প্যানারোমিক ভিউ।  সিএনএন এটিকে ইউরোপ এর সবচেয়ে উদ্ভট ভবন বলে আখ্যায়িত করেছে।

 

এটোমিয়ামের পর চলে আসা হয় পাশের পুরনো রাজবাড়িতে। চালক দেলোয়ারের বদান্যতায় কেবল পুরনো নয়, নতুন রাজবাড়িও গমন সম্ভব হয়। ইউরোপীয় ইউনিয়নের সদর দপ্তর পরিদর্শন এর  জন্য বিজ্ঞান সচিব নাজমুল হুদা খান আমাকে পরামর্শ দিয়েছিলেন।  তাই প্রথম ইউরোপলই দেখতে হলো। দুটো ভবনই আলিশান এবং অতি চমৎকার।  ইউরোপীয় ইউনিয়ন সদর দপ্তরের সামনে গিয়ে স্তম্ভিত হই। এত বড় কাচ-ভবন ? ব্রাসেলসকে বল হয় ইউরোপীয় ইউনিয়নের রাজধানী, যদিও ইউরোপীয় ইউনিয়ন আনুষ্ঠানিকভাবে কোন রাজধানী ঘোষণা করেনি।  আমস্টারডাম চুক্তির মাধ্যমে আসলে ব্রাসেলসকে পার্লামেন্টের কাজ চালানোর অনুমতি দেয়া হয়েছিল মাত্র। মে মাস বিদায়, জুনে  দ্বিতীয় দিবসে উঠি লেপেলবেড হোটেলে। সেটি মিলে শহর।  সরাদিন ল্যাব সাদা অ্যাপ্রোন পরে কাটিয়ে  Gent শহরে যাওয়া হয়।  পুরনো এ শহরে একটা খাল বা নদী পেয়ে পুলকিত হই। কাছে কোথাও  বিমানবন্দর থাকায় শহরের আকাশজুরে পাই বিমানের ধোয়ার আঁকিঝুঁকি, নকশা, ও ধুম্র-ডিজাইন।  শুনেছি গেন্ট এর বিশ্ববিদ্যালয়টি বিখ্যাত। এখানে খাল নদীর পাশাপাশি দেখি ফুলগাছ, আর চারদিকেই রেস্টুরেন্ট এর ছড়াছড়ি।  Melle Leeuw স্টেশনে হয়ে আবার লেপেলবেডে ফিরে আসি। আমাদের কাঠের কক্ষে অনেক স্পেস, চারটি বেড, মানুষ মাত্র দুইজন, আমি আর মোখলেছ।

 

রাতে ল্যাব কর্তৃপক্ষ আমাদের  নৈশভোজে  আমন্ত্রণ জানায়।  হোটেলে গিয়ে পাশের হলরুমে একটি বিয়ের অনুষ্ঠান দেখতে পাই। তবে বিয়েটা হচ্ছে  দুই নারীতে। সমলিঙ্গের বিবাহ ওই সমাজে স্বীকৃত। প্রচুর লোক  সমাগম হয়েছে এবং ওরা নাচ-গানে একেবারেই মেতে উঠেছে। একটি নিগ্রো ও একটি শ্বেতাঙ্গ নারী। দুজনেই লম্বা, কালোজন মেয়ে পোষাক পরিহিতা, সাদাটি ছেলের মতো, কেবল বুক ঢাকা, তবে পিঠ উদাম। খেতে যুবক শাশার সঙ্গে আলাপ জমে উঠে।  সেও  একমত হয় এটা Lesbianism.  শাশা জানায়, নেদারল্যান্ডস এর আঞ্চলিক এবং  কিঞ্চিৎ অশ্লীল ভাষাটির নামই Flemish। তবে এটি নান্দনিক অশ্লিলতা।  উত্তম স্বাস্থের অধিকারী এ শাশাকে আমি নাম দিয়েছি ‘ বাঘের বাচ্চা’।   সে গতকাল বদলি হয়ে এ ল্যাবে যোগদান করেছে।  পরদিন বাড়ি ফেরার তাড়ায় প্রায় প্রত্যেকরেই ঘুম ভাংগে প্রত্যুষে।  খালি রাস্তায় বিশ মিনিটের পথ অতিক্রম করে খবর পাই, আমরা মাছুমাকে ফেলে এসেছি। সে ঘাবড়ে যায় এবং কান্নাকাটি করে হোটেল-অফিসের মাধ্যমে আমাদের সঙ্গে যোগাযোগে সক্ষম হয়।  একটা গাড়ি ফিরে যায় এবং  অতিরিক্ত অধাঘন্টা পর ওক বিমানবন্দরে নিয়ে আসতে সক্ষম হয়। এটি আসলে দলগত ব্যর্থতা, দলের মধ্যে এমনটি হওয়া কাঙ্খিত নয়।  তবে ভুক্তভোগীর ব্যক্তিগত দায়িত্বও রয়েছে।

 

ইতিহাদ বিমানটি নড়েচড়ে দৌড় দিয়ে আকাশে উড়ল কত কথাই না মনে পড়ে!  মনে পড়ে আমস্টারডাম সিটি ট্যুর কীভাবে পরিদর্শন করেছিলাম ডায়মন্ড ফ্যাক্টরি, কোনো এক অজ্ঞাত রেলষ্টেশনে কীভাবে স্তম্ভিত হয়েছিলাম দেবশিশুর মতো সুন্দর শিশু দেখে। ওই খান থেকে ফিরতে কভিাবে কয়েক সেকেন্ডের জন্য ট্রেনটি মিস করে আধাঘন্টা পর অন্য ট্রেনে ব্রাসেলস ফিরেছিলাম।  স্মৃতিতে সমুজ্জ্বল পরেরদিন কীভাবে প্যরিস মেতেছিল উন্মাদের মতো, পৃথিবীর কত শত ভাষার মানুষের  কথা শুনে ছিলাম আইফেল টাওয়ারের গোড়ায়।  তারপর লুভ মিউজিয়াম, মোনালিসার অদ্ভুত হাসি.. Thaly’s ট্রেনের ছাদে শিলাবৃষ্টি পতনের শব্দ..।  এবার ইউরোপে এসে এ স্বল্পকালীন প্রবাসেই অনেক আবেগের  জায়গা তৈরি হয়।  আমাদের এগিয়ে দিতে আসা মিস ক্রিস্টিন যতক্ষণ বিভিন্ন স্তর অতিক্রম করে আমাদের কাচের  ভেতর দিয়ে দেখা যায় ততক্ষণ পর্যন্ত দাড়িয়ে ছিল।  বিমানবন্দরে শেষ মূহুর্তের স্যুভেনির  কেনাকাটায় আকাতরে বিলেয়েছে ধাতব ইউরো-মুদ্রা। আমরা তাকে হাত নেড়ে বিদায় জানাই। ইউরোপ এমনও হয়।

 

বিচিত্র অভিজ্ঞতা

 

  • Wetteren স্টেশনে যেতে বাসে অপর এক বৃদ্ধের সঙ্গে আলাপ হয়। তাকে এক পর্যায় জিজ্ঞেস করি:  Vous puvez parler Francais ?  তিনি ধরে নেন আমি খুব ভাল ফরাসি জানি। (এক সময় জানতাম বটে)  এ ধারণা থেকে তিনি আমার সঙ্গে অনর্গল নিজস্ব স্টাইলে ফরাসি ভাষায় কথা বলে যান, যার মাথামুন্ড কিছুই বুঝিনি।  কেবল তার সঙ্গে তাল মিলিয়ে বলে গিয়েছি হ্যাঁ, না, অনেক ধন্যবাদ ইত্যাদি।  একথা  ল্যাবের  মিস মিক-কে জানালে তিনি খুব হাসাহাসি করেন। ( মিস মিকে পাতলা ও লম্বা যার বীপরীত মিস ক্রিস্টিন যে কি না আমাদের প্রটোকল দেন।)
  • বেলজিয়াম সম্পর্কে আমার ধারণা ছিল উচ্চ। সেটি যথাযথ পেয়েছি, কিন্তু কিছু ক্ষেত্রে তার ব্যতিক্রম লক্ষ্য করলাম। যেমন- ব্রাসেলস শহরটি কিছুটা নোংরা। স্টেশনে অনেক ময়লা-আবর্জনা দেখেছি, এমনকি বিষ্ঠাও  দেখতে পাই। যেভাবে হাইরাইজ ভবনের  সামনে জমে থাকা বৃষ্টির পানিতে অনেক পলিথিন ভাসতে দেখি, তাতে আশ্চর্য না হয়ে পারি না।
  • ইউরোপ বর্তমানে কৃপণ হয়ে গেছে। এখন আর শপিং করলে বিনা পয়সায় উন্নমানের পলিব্যাগ দেয় না।  একদিন Carrefour শপে কেনাকাটা শেষে শপিং ব্যাগ চাইলে  দোকানি বলে তোমাকে দশ সেন্ট দিয়ে নিতে হবে।  পাশে দাড়ানো একটি বেলজিক তরুণী ফোড়ন কাটে, এখানে তুমি কোনো কিছুই বিনা পয়সায় পাবে না। কারণ এটা বেলজিয়াম।  তারপর উভয়েই সশব্দে হেসে উঠি।
  • বেলজিয়াম এর সঙ্গে প্রাকৃতিকভাবে বাংলাদেশের অনেক মিল আছে।  এখানে অনেক খানাখন্দ, জলধারা দেখেছি। এসেবে বাংলাদেশের মতো অনেক বর্ষাকালীন জলজ উদ্ভিদ রয়েছে , যেমন – শাপলা, ও অন্যান্য।  বাতাসে সব সময় তুলোর মতো  কী যেন  ওরে। ‍  এগুলো হয়তো বায়ুদুষণ। শৌচাগারে প্রায়ই ময়লার স্তুপ দেখেছি।
  • এখানে বাস করে অনেক স্বল্পোন্নত দেশের মানুষ। মরোক্কানদের  বাঙালী নাম দিয়েছে খেজুর।  অনুন্নত দেশের মানুষ ওই খানে গিয়ে চুরি –চামারি করে দেশটাকে বিনষ্ট করেছে।  তাই বেলজিকরা সব সময় আমাদের ব্যাগ  ও মূল্যবান  দ্রব্য সাবধানে রাখতে বলে। একদিন গাড়ির সিটে ক্যামেরার  কভার রেখে কেবল ক্যামেরাটি নিতে চাইলে রফিকুল ইসলাম বলেন: এটিও নিয়ে নিন, কারণ  ওরা তো  আর জানবেনা যে কাভারটি খালি। কাজেই ওটা নিতে চোররা গাড়ির কাচ ভেঙ্গে ফেলবে।
  • ল্যাব ভিজিট এবং যে কোনো আলোচনায়  বসার আগে ওরা প্রায়ই  আমাদের academic discipline জানতে চেয়েছে।  বিসিএসআইআর এর বিজ্ঞানীরা বলেছেন কারো Chimistry কারো Molecular biology বা অন্য কিছু। বাকি তিন জন বলেছি Town Planning , Public Administration কিংবা আমাদের বিষয় শুনে ওরাহেসেছে, বিস্মিত হয়েছে।  এক পর্যায় ড. মমতাজ দৌলতানাকে বললাম, আপা পুনরায় কেউ জিজ্ঞেস করলে বলব,  Molecular Public Administration শুনে সবাই হাসলেন। তারপর মাছুমা  বলল, খুব বেশি  বলবেন স্যার এবং সাকুল্যে একবারই বলবেন।  কারণ বিষয়টি কী, কারো কারো জনার আগ্রহ জন্মাতে পারে।  বেলজিয়ামে আমাদের বিস্ময়ের  অন্ত ছিল না তাদের  খাদ্য দ্রব্যের  মান নিয়ন্ত্রণ এর দক্ষতা ও সামর্থ্য দেখে।  ভেজাল দূরীকরণেও তারা সিদ্ধহস্ত, যা থেকে আমরা অনেক অনেক দূরে।

 


পারিবারিক রোড ট্রিপস

পারিবারিক রোড ট্রিপস এর জন্য কেন গাড়ি ভাড়া করবেন তার ৬ টি কারণ

আপনার পরিবারকে সম্ভবত এখন একটি ট্রিপের জন্য জিজ্ঞাসা করা হয়েছে। একটি অবিস্মরণীয় ট্রিপ যা তাদের শহর জীবন থেকে অব্যাহতিতে সাহায্য করবে, এবং আপনি অবশেষে এটি বিবেচনা করবেন। আপনি ইতিমধ্যে গন্তব্য ঠিক করে নিয়েছেন, এবং এখন আপনার উদ্দেশ্য পূরণের জন্য একটি গাড়ী খুঁজে বের করতে হবে। আপনি এই সড়ক পথে ভ্রমণের জন্য একটি গাড়ী ভাড়া করতে পারেন। অবশ্যই হ্যাঁ! পারিবারিক সড়ক পাথে ভ্রমণের জন্য সম্ভবত গাড়ি কেন ভাড়া নেওয়া উচিত তা আপনার জানা উচিত।

১। ব্যবহারাদির ফলে ক্ষয়

এটির সাধারণ ধারণা যে আপনি যত বেশি ড্রাইভ করবেন, তত বেশি রক্ষণাবেক্ষণের প্রয়োজন হয়। দীর্ঘ ভ্রমণ আপনার গাড়ীতে আঘাত এবং মেরামতের প্রয়োজনীয়াতার সৃষ্টি করে। ১,০০০ মাইল এর জন্য আপনার গাড়ীর ড্রাইভিং কল্পনা করুন। কিন্তু আপনাকে শুধু গ্যাস ট্যাংক ভর্তি করার চেয়ে আরো বেশি কিছু করতে হবে।

সস্থায় পুরনো গাড়ি ভাড়া করবেন না। এতে আপনার গ্যাস বেশি খরচ হবে। গাড়ি রাস্তায় বন্ধ হয়ে যেতে পারে। প্রতিদিন ৫০০ টাকা বাঁচাতে গিয়ে আপনার ১০০০ টাকা করে অতিরিক্ত খরচ হয়ে যাবে। আর আপনি পুরনো গাড়ীতে চরে আরামও পাবেন না।

  1. আপনি আরো স্থান অর্জন করতে পারেন

সমস্ত ভ্রমণ একই নয়। আপনার পরিবারকে সমুদ্র সৈকত থেকে ঘুড়িয়ে নিয়ে আসা আর আপনার বাড়ির কাছ থেকে একটি ছোট দূরত্বের এক শহর থেকে অন্য শহরে ভ্রমণের মতো নয়। পুরো ট্রিপের জন্য আপনার প্রয়োজনীয় সমস্ত ব্যাগ আর লাগেজ সংরক্ষণ করার জন্য একটি বড় গাড়ি ভাড়া করতে হবে।

আপনার গাড়ী সম্ভবত একটি পরিবার ট্রিপ জন্য খুব ছোট। তাই আপনার উচিৎ অতিরিক্ত স্থান আছে এমন গাড়ী যেমন SUV, বা একটি Minivan যেমন Noah X বা Hiace ভাড়া করে যেতে পারেন।

  1. ‘কি হবে’ আপনার এটা নিয়ে চিন্তিত হওয়ার কিছুই নেই।

যদি আমার গাড়ীর রাস্তায় কিছু হয়? যদি এই গাড়ি টি এই ভ্রমণের জন্য উপজুক্ত না হয়? এটা হলে কি হবে, ওটা হলে কি হত? আপনি নিজেকে এই সমস্ত যদি জিজ্ঞেস করতে হপারেন। কার রেন্টাল এজেন্সি গুলো তাদের গাড়ী ভাড়া দেওয়ার পূর্বে ভাল করে পরীক্ষা করে।

গাড়ী নিয়ে আপনার সমস্যায় পতিত হওয়ার সম্ভাবনা ক্ষীণ। কোন এজেন্সি চায় না তাদের রেপুটেশন খতিগ্রস্থ হোক। তাই যা কিছু ঘটুক তারা তা দ্রুত সমধান করার চেষ্টা করবে। অনেক এজেন্সি ইনস্যুরেন্স করা থাকবে।

৪। ভিন্ন ভিন্ন গাড়ী চালানো আপনাকে আনন্দ দিবে।

আপনার হয়ত নিজের একটা গাড়ী আছে, এটা আপনাকে ভ্রমনে তেমন একটা বেশি আনন্দ দিবে না, কেননা এটা একই গাড়ী চালাতে আপনার ভাল নাও লাগতে পারে। ছুটি এবং ভ্রমণ আনন্দপূর্ণ হওয়া উচিৎ। হয়তবা আপনি এমন একটা গাড়ী ভাড়া করতে পারেন যেটা আপনি সব সময় চাইতেন, অথবা এমন একটি সুপার কার।

আপনি যখন একটি নতুন গাড়ী কিনতে যাবেন তখন রিভিউজ এর উপর নির্ভর না করে, এমন একটি গাড়ী কিনুন যেটা লং ড্রাইভ এর জন্য উপযুক্ত।

৫। আপনার কিচু অর্থ বাঁচান উচিৎ

সম্ভবত আপনাকে ভ্রমণের জন্য চাপ দেওয়া হচ্চে, কিন্তু আপনার ব্যাংক একাউন্ট এর অবস্থা যাচ্ছে তাই। কিন্তু আপনি আপনার ভ্রমন বাতিল করতেও পারছেন না। তেল খরচ কম হয় এমন গাড়ী ভাড়া করুন।

কিন্তু তেল কম খরচ হয় এমন গাড়ী পাওয়ার জন্য আপনাকে অবশ্যই দেখে শুনে নিতে হবে, যেহেতু এগুলোর চাহিদা বেশি তাই আগে থেকেই বুকিং দিন।

আপনি প্রচুর টাকা বাঁচাতে পারেন যদি আপনি বোথ ওয়ে (যাওয়া আশা) গাড়ী ভাড়া করেন একজনের কাছে।

৬। একটি নতুন গাড়ী ভাড়া করুন যাতে আপনাকে কোন দুশ্চিন্তায় পড়তে না হয়

একটা নতুন গাড়ীতে পুরাতন গাড়ির মত অত সমস্যা নেই। বেশীর ভাগ কার রেন্টাল কোম্পানিতেই নতুন গাড়ী পাওয়া যায়, যেগুল অল্প কিছু দূর চলেছে।

যে গাড়ী গুলো ভালো ভাবে মেইনটেইন করা হয়, তাদের গ্যাস মাইলেজ বেশী পাওয়া যায়। হয়তবা এগুলো আপনার ব্যক্তিগত গাড়ীর চেয়েও ভালো এবং ওয়েল ইকিউইপ্ট এবং অতিরিক্ত অনেক ফিচার পাওয়া যাবে।

ভ্রমণ হচ্ছে মধুর বিষয় – এবং এটা আপনার পরিবারকে যথেষ্ট আনন্দ দিতে সাহায্য করবে। একটি নতুন গাড়ী আপনার অভিজ্ঞতার ঝুড়িকে ভারী করবে এবং আপনার ভ্রমণকে স্মরণীয় করে তুলবে। আপনার পরের ভ্রমণের জন্য একটি গাড়ী ভাড়া করুন।

 


ফ্যামিলি

ফ্যামিলি

 

সাফারির রোমাঞ্চকর অভিযানে একা কেন বেরোবেন, সঙ্গে নিন পরিবারের সকলকে। ভারতের বিভিন্ন জঙ্গল ও রাজস্থানের মরুভূমিতে চিপ, এলিফ্যান্ট আর ক্যামের সাফারিতে আপনার সঙ্গী আশোক মান্না ও তানাজী সেনগুপ্ত।

 

জিপ সাফারি।

 

’দি ল্যান্ড অফ টাইগার’ হিসেবে খ্যাত বান্ধবগড়।  ন্যাশনাল পার্ক কার সাফারির জন্যে বেশ পরিচিত।  মধ্যপ্রদেশের এই জাতীয় উদ্যান ৪৪৯ স্কোয়ার  মিটার জুড়ে এক সুবিস্তৃত সংরক্ষিত বনাঞ্চল। একে ঘিরে আছে বিন্ধ্য পর্বতের বত্রিশটি ছোট –বড় পাহাড়।  বাঘ ছাড়াও এখানে আছে নানা বন্যপ্রাণী। শম্বর, চিতল, বন্য শুয়োর, নীলগাই, চিঙ্কারা, চিতাবাঘ, প্যান্থার, হরিণ ও হায়না।  আছে  নানারকম পাখি এবং অসংখ্য প্রজাতির প্রজাতি। । চারদিকে রয়েছে শাল, আমলকী, মহুয়া, কেন্দু, বহেড়া গাছের  সারি।  গহিন জঙ্গল, ঘন ঘাস- মাঝ দিয়ে বয়ে চলেছে চরণগঙ্গা নদী । ওয়াটার হোল বা জলাশায় রয়েছে অনেক।

বান্ধবগড় ন্যাশনাল পার্কের ১০৫ বর্গকিমিতে ঘোরা যায় স্বচ্ছন্দে।  জিপ সাফারিতে একদিকে মেলে জঙ্গল ঘোরার আনন্দ, অন্যদিকে রোমাঞ্চও মেলে কম নয়।  ১৫ অক্টোবর থেকে ত্রিশ জুন পর্যন্ত এই সাফারিতে চলে দু’বার- সকাল সাড়ে পাঁচটা থেকে সাড়ে ছ’টার মধ্যে এবং দুপুর আড়াইটে থেকে চারটে মধ্যে। প্রথমবার সাড়ে চার ঘন্টার জন্য, বিকেলে তিন ঘন্টার জন্যে।  স্থানীয় রিসর্ট মালিক এবং সরকারি ব্যবস্থাপনায় এই সাফারিতে একটি জিপে পাঁচজন যাত্রী নেওয়া হয়, সঙ্গে থাকেন কর্তৃপক্ষ ‍নিযুক্ত একজন গাইড । তিনটি পার্ক সাফারি জোন আছে – তাল জোন (গেট ১) মাগদি জোন (গেট -২) ও পার্কে ঢুকে  এই জিপ সাফারিতে অংশ নিন।

কী ভাবে যাবেন: হাওড়া থেকে মুম্বই মেলে কাটনি আসুন, সেখান থেকে জিপে বান্ধবগড়।

কোথায় থাকবেন: বান্ধবগড়ে প্রচুর বাজেট হোটেল আছে। আছে থ্রি স্টার, ফোর স্টার ও লাক্সারি রিসর্ট।

কখন যাবেন: অক্টোবর থেকে মে মাস।

 

এলিফ্যান্ট সাফারি

 

গুয়াহাটির উত্তর-পূর্বে ব্রক্ষপুত্রের ধারে গড়ে উঠেছে। কাজিরাঙ্গা জাতীয় উদ্যান। ভারতীয় একশৃঙ্গী গন্ডারের জন্যে কাজিরাঙা আজ বিশ্বখ্যাত। শুধু মাত্র বিভিন্ন ধরনের বন্য জন্তজানোয়ার  দেখার লোভেই নয় প্রকৃতির অনন্য রূপ সৌন্দর্য দেখার লোভেইও বহু প্রকৃতিপ্রেমিক কাজিরাঙ্গায় ছুটে আসেন।  এত গন্ডায় একসঙ্গে বিশ্বের আরও  কোনও ন্যাশনাল পার্কে দেখতে পাওয়া যায় না।  শুধু গন্ডারই নয় এখানে দেখতে পাবেন বাঘ, হাতি, বাইসন ইত্যাদি জন্তু এবং নান প্রজাতির অসংখ্য হরিণ। এসব দেখার জন্যে সরকারি তরফে রয়েছে জিপ এবং হাতি সাফারির ব্যবস্থা। বনবিভাগের জিপ বা হাতির পিঠে  সওয়ার হয়ে বার্ড ওয়াচিং ট্যুরে অংশ নিতে পারেন। পার্কের নান রেঞ্জ থেকে এই সাফারি শুরু হয়।  সকাল পাঁচটায় বনবিভাগের জিপ বা মিনিবাসে তিন কিমি গিয়ে মিহিমুখ হাতি পয়েন্ট থেকে হাতির পিঠে চড়ে বন্যজীবজন্ত দেখার ব্যবস্থা আছে।  ট্যুরিস্ট লজের কাছেই বনবিভাগের  অফিসে বুকিং করে নিন। হাতি সাফারির চাহিদা খুব বেশি।  তাই আগেভাগে বুক করে নিন।  সকাল পাঁচটা এবং ছটায় ঘন্টাখানেকর এই সফরে গোটা পঁচিশেক হাতি যাচ্ছে জঙ্গলের খাল বিল জলায়। ছ মিটার উচু শরবনের  ভিতর দিয়ে দুলকি চালে হাতি চলেছে গান্ডারের সাম্রাজ্যে।  এভাবে যেতে যেতে চোখে পরবে নানা ধরনের পাখি এবং পরিযায়ী হাঁস।  হরিণের পালও চোখে  পড়া বিচিত্র কিছু নয়। এখানে বিলের ধারে প্রায় মানুষ সমান ঘাস জন্মায়।  এই ঘাস বনেই বিশাল দেহ নিয় একশৃঙ্গী গন্ডার।  নির্ভয়ে মনের আনন্দে ঘাস খেয়ে বেড়ায়।

কীভাবে যাবেন: কলকাতা থেকে অসমগামী যে কোন ট্রেনে গুয়াহাটিতে নামুন। সেখান থেকে বাসে বা গাড়িতে চজলে আসুন কাজিরাঙায়। নিকটতম বিমানবন্দর  জোড়হাট।  কলকাত থেকে বিভিন্ন সংস্থার বিমান এখানে আসে।

কোথায় থাকবেন: অসম পর্যন্টন বিভাগের অনেকগুলি ট্যুরিস্ট লজ আছে কাজিরাঙ্গায়।  উল্লেখযোগ্য কয়েকটি: প্রশান্তি ট্যুরিস্ট লজ, অরণ্য লজ, বনশ্রী লজ, প্রভৃতি।

 

কখন যাবেন: নভেম্বর থেকে এপ্রিল পর্যন্ত কাজিরাঙায় যেতে পারেন।  আগে বুকিং  করে নেবন।

 


পাহাড়েরর পথে পথে

পাহাড়েরর পথে পথে

 

পাহাড়ের টানে চলুন ভারতের নানা জায়গায় । জেনে নিন পাহাড়ের ভ্রমণ-বৃত্তান্ত।

 

তুঙ্গনাথ

 

চোপতাকে বলা হয় তুঙ্গনাথের গেটওয়ে। উচ্চতা ৩৮৮৬ মিটারের কাছাকাছি। দুরূহ চড়াই পথ তবে গুর্গম নয়। কংক্রিটের বাধানো, মসৃণ।  এ পথে চলার জন্যে ট্রেকিংয়ের অভিজ্ঞতা না থাকলেও চলবে। স্বচ্ছন্দে সপরিবারে যাওয়া যায়। হাঁটতে না পারলে ঘোড়া, ডান্ডি কিংবা কান্ডিতেও যেতে পারেন। পঞ্চকেদারের অন্যতম এবং হিন্দুদের পবিত্র শৈবতীর্থ এই তুঙ্গনাথ। উচ্চতায় কেদারনাথের থেকেও বেশি। শুধু তাই নয়, ভারতের সর্বোচ্চ মন্দির তুঙ্গানাথ। তুঙ্গনাথের পথে কেদারের মতো ভিড় নেই, নেই দূষণ।  হাতে গোনা অল্প পর্যটক এখানে বেড়াতে আসেন।  এখানকার প্রাকৃতিক সৌন্দর্য চোখ চেয়ে দেখার মতো। মাথার উপর গাছের ছায়া, পাখির কাকলি আর বিচিত্রধর্মী ফুল- সব মিলেয়ে এক সুন্দর যাত্রা। কিছুটা এগোতেই সামনে পড়ে সবুজ ভেলভেটে মোড়া এক বিস্তৃত বুগিয়াল। দলে দলে ভেড়া চড়ছে সেখানে। উপত্যাকার একপাশে বেশ কিছু অস্থায়ী ঘরবাড়ি এবং দুটি চায়ের দোকানও আছে এখানে। বিশ্রামের জন্যে এর থেকে ভাল জায়গা আর কী হতে পারে! শীতকালটা এ সব জায়গা ঢেকে থাকে পুরু বরফের চাদরে।  ঘুরে দেখা যায় ভ্যালিটা।  কিছুক্ষণ এখানে কাটিয়ে আবার হাটতে শুরু করুন। যত সামনের দিকে যাবেন, পথ তত খাড়া। পথের বাঁদিকে রয়েছে বিপদজনক গভীর খাদ। এরকম এক বাঁকের মুখে একটা একটা দোকান পেয়ে আবার বসা। তৃষ্ণা নিবারণ করুন রডোডেনড্রনের নির্যাস থেকে তৈরি বিশেষ এক ধরনের পানীয় খেয়ে।  এটা নাকি বলবর্ধক এবং বেদনা নাশক। ‍তুঙ্গনাথ পৌছেতে মোট ঘন্টা দুয়েক লাগল। তুঙ্গনাথ ভ্যালিটা বেশ বড়।  মন্দিরের কিছুটা আগে থেকেই রাস্তার পাশে বেশ কিছু দোকান। মন্দিদেরর গঠনশৈলি কেদারনাথের মতো, তবে আয়তনে অনেক ছোট। পাশের পাহাড় বেয়ে তিনটি ঝরনা নামছে আকাশকুন্ডে।  আকাশগঙ্গা নদীর উৎস এই আকাশকুন্ড।  রাতে অসম্ভব ঠান্ডা পড়ে তুঙ্গনাথ। সে কারণে দিনের দিন তুঙ্গনাথ দর্শন করে চোপাতায় ফিরে আসাই ভাল।  আর যারা তুঙ্গনাথ থেকে চন্দশিলা যেতে চান, তাদের এখানে রাত্রিবাস আবশ্যক। কারণ চন্দ্রশিলালার প্রশস্তি সর্যোদয়ে।  তা ছাড়া গাড়োয়াল ও কুমায়ুন হিমালয়ের অসংখ্য নামীদামী পর্বতরাজি এখান থেকে সুন্দর দৃশ্যমান।

 

কীভাবে যাবেন: বাংলাদেশ থেকে হাওড়া। হাওড়া থেকে ট্রেনে হরিদ্বার।  হরিদ্বার কিংবা হৃষীকেশ থকে বাসে উখিমঠ।  উখিমঠ থেকে বসে বা শেয়ার জিপে চোপতা।  চোপতা থেকে হাঁটা পথে কিংবা ঘোড়ায় তুঙ্গনাথ।

 

কোথায় থাকবেন: চোপতায় থাকার জন্যে আছে হোটেল হিমালয়, রাজকমল, বুগিয়াল ছাড়াও  চটির হোটেল।  তুঙ্গনাথের থাকার জন্যে আছ হোটেল মোটেল তুঙ্গেশ্বর, চন্দ্রশিলা, নীলকন্ঠ, হিমালয় গণেশ এবং কালীকমলীর ধরমশালা ও মন্দির কমিটির রেস্ট হাউস।

কখন যাবেন:  মে থেকে অক্টোবর পর্যন্ত তুঙ্গনাথ ভ্রমণের আদর্শ সময়।

 

রংপো

 

পশ্চিমবঙ্গ আর সিকিমের সীমান্ত শহর রংপো।  শহর লাগোয়া শান্ত, শুনশান পাহাড়ের কোলে সবুজ বনাঞ্চল।  এন জে পি স্টেশন থেকে  মিলবে গাড়ি। শিলিগুড়ি শহরঞ্চল পার হলেই সেবক। চারচাকা অনেক নীচে তিস্তার খরস্রোতা জলরাশিতে রবাবের ভেলায় দেখা যাবে র‌্যাফটিংয়ের জলছবি।  ৩১ নং জাতীয় সড়ক ধরে যেতে যেতে পেরিয়ে যাবে কালীঝোরা, তিস্তাবাজার।  এরপর মেল্লি। পাহাড়ি পথের ধারে দোকানপাট, বাড়িঘর নিয়ে জমজমাট এই ছোট জনপদ।  মেল্লি ছেড়ে খানিক এগুতেই রাস্তার বুকে তোরণদ্বার ।   পার হলেই রংপো শহর শহরে ঢোকার আগেই পাহাড়ি পথের দুপাশে শাল-সেগুনের সংরক্ষিত সবুজ বন।  রাস্তা জুড়ে রৌদ্রছায়ার খেলা।  প্রথম দর্শনেই মন জয় করে নেয় কংক্রিটের ছোট দোতলা অরণ্যনিবাসটি।  চত্বরে একফালি বাহারী বাগান।  দূর থেকে দেখা যায় পাহাড়ের গয়ে সিকিমির ঘরবাড়ি। সবুজের আঙ্গিনায় বসে রৌদ্রস্নান করতে করতে উপভোগ করুন পাহাড়ে মেঘ – রৌদ্রের কত রঙ্গ।  বেরিয়ে পায়ে হেঁটে পাড়ি জমানো যায় পাহাড়িয়াদের বসতিতে।  যেতে যেতে সেই পথে সিঙ্কোনা, সেগুন, বাঁশঝাড় আর ঝাউয়ের শব্দ। দেখা হয়ে যায় আদা, এলাচে খেত।  গাড়ি নিয়ে এক দিনে যাওয়া যাওয়া যেতে পেরে মানসং, আলগাড়া –র-পথে। বিকেলে ঘোরাঘুরি করেত পারেন রংপো শহরে। খেতে পারেন অতি উপাদেয় গরমাগরম মোমো আর রসমালাই।

ঘুরে আসুন লেয়ার মার্তাম ওয়াটার গার্ডেন গ্যাংটকগামী পথের ধারে পাহাড়ি নদীর পাশে চমৎকার জায়গা। ভীতরে সিমেন্ট বাঁধানো  ছোট ছোট পদ্মপুকুর, মরশুমি ফুল, ফেয়ারি করা বাগান আর গাছপালায়  সাজানো। পাহাড়ি প্রকৃতিকে তারিয়ে তারিয়ে উপভোগের জন্যে পাতা রয়েছে কাঠের বেঞ্চ।  ক্যাফেটেরিয়াতে মিলবে চা, কফি, স্ন্যাকস। রাত্রিবাস করতে চাইলে সে ব্যবস্থাও আছে।

কী ভাবে যাবেন: কলকাতা থেকে ট্রেনে এন জে  পি। স্টেশন চত্বর থেকেই পাওয়া যায় রংপো যাওয়ার প্রাইভেট গাড়ি।  পৌঁছে দেবে রংপো ফরেস্ট রেস্ট হাউসে।  বাসে ধর্মতলা থেকে মিলবে শিলিগুড়ির বাস। নামুন তেনিজিং নোরগে বাস টার্মিনালে।  গ্যাংটকগামী বাস বা জিপে আসুন।

 

কোথায় থাকবেন: বনবাংলোতে থাকতে চাইলে যোগাযোগ করুন- পশ্চিমবঙ্গ বন উন্নয়ন নিগম, ৬এ, রাজা সুবোধ মল্লিক স্কোয়ার, কলকাতা -১৩। অথবা ডিভিশনাল ম্যানেজার কালিম্পং ডিভিশন, ডব্লু বিএফডিসি, কালিম্পং

কখন যাবেন: মার্চ  থেকে জুন ও সেপ্টেম্বর থেকে ডিসেম্বর।

 

বিন্দু

 

ডুয়ার্সের পর্যন্টন পকেন্দ্রগুলোর মধ্যে বিন্দুর জনপ্রিয়তা এখন তুঙ্গে। ভারত-ভুটান সীমান্তে, জলঢাকা নদীর তীরে ভারতের শেষ গ্রাম বিন্দু। এর প্রাথমিক এবং ভৌলিক গুরুত্ব অনস্বীকার্য।

 

দুর থেকে দেখা যায় পাহাড়ের গায়ে সিকিমের ঘরবাড়ি।

সবুজের আঙিনায় বসে রৌদ্রস্নান করতে করতে উপভোগ করুন পাহড়ে মেঘ-রৌদ্রের কত রঙ্গ।

বেরিয়ে পায়ে হাটে পাড়ি জমানো যায়।  পাহাড়িয়াদের বসতিতে।

যেতে সেই পথে সিমঙ্কোনা, সেগুন, বাঁশঝাড় আর ঝাউয়ের শব্দ।

দেখা হয়ে যায় আদা, এলাচের খেত বিকেলে ঘোরাঘুরি করতে পারেন রংপো শহরে।

ভারতের প্রথম জলবিদ্যুত কেন্দ্রে জলঢাকা হাইডেল প্রজেক্ট গড়ে ওঠে এখানেই।  চারপাশ পাহাড় ঘেরা, ছবির মতো সাজানো ঘরবাড়ি, গ্র্রামীণ হার্ট, অর্কিড আর ফুলের সমারোহ নিয়ে সারা বছরই সেজে থাকে বিন্দু।  এলাচ চাষের জন্যে বিন্দু বিখ্যাত ।  চা বাগানের মধ্যে ঘুরে বেড়াতে বেশ ভালই লাগবে।

 

শিলিগুরি থেকে মাত্র একশত চার কিমি দূরে বিন্দু।  যেহেতু সারাদিনে দুটি মাত্র বাস চলে এ পথে, তাই শিলিগুড়ি থেকে পর্যাপ্ত সময় নিয়ে সব যেমন ঘুরে দেখা যায়, বেড়ানোর মজাটাও তেমন উপভোগ করা যায় ষোলো আনা। এই পথে হাটতেও ভাল লাগবে।  গ্রামের রাস্তা ধরে ট্রেকিংও করতে পারেন।  ট্রেকিং এবং হাইকিং করার জন্যে বিন্দু আদর্শ। মাহানন্দ রিজার্ভ ফসেস্টের বুক চিরে ৬৪ কিমি দূরের চালসা হয়ে আরও কিছুটা এগিয়ে কুনিয়া মোড় থেকে পথ ঘুরে যাবে উত্তরে চাপামারির অরণ্যের ভিতরে।  দুপাশে দু’পাশে পর্ণমোচী বৃক্ষের ঘন অরণ্, মাঝখানে পিচঢালা মৃসণ পথ – এপথেই আরও চার কিমি এগোলে চাপরামারির তোরণদ্বার।  মাঝে ছোট ছোট জনবসতি।  চোখে পড়তে পারে হাতির দলের রাস্তা পেরনোর দৃশ্য।  পুরো জঙ্গলই নানা প্রজাতির পাখির দেখা মিলবে।  তাই বার্ড ও ওয়াচিং করতে চাইলে বিন্দু আসতে পারেন।  বিন্দু ড্যাম গৌরীবাস। গৌরীবাসের প্রসিদ্ধি ভেষজ উদ্ভিদ চাষ ও ওষুধ তৈরির  জন্যে। এখানে গাড়ি থামিয়ে ঘুরে দেখে নেওয়া যায় বিস্তৃত অঞ্চল জুড়ে সিঙ্কোনার চাষ। গৌরিবাস রেখে কিছুদূর এগোতেই আর এক গ্রাম ঝালং।  গ্রামের বুক দিয়ে বয়ে চলেছে জলঢাকা নদী। নদীর  তীরেই গড়ে উঠছে জলঢাকা হাইডেল প্রজেক্টের উপনগরী। বিন্দু আর ঝালং এর মাঝে পড়বে আর পাহাড়ি গ্রাম প্যারেন। ঘুরে দেখা যেতে পারে গ্রামটি। মূলত জলঢাকা নদী আর প্রকৃতি নিয়েই বিন্দু। চারিদিকে যেন সবুজ গালিচা বিছানো।  ভুটান থেকে বিন্দু নদী এসে মিশেছে জলঢাকায়, সঙ্গমে বাঁধ দিয়ে গড়ে উঠেছে জলঢাকা জলবিদ্যুৎ প্রকল্প। কর্তপক্ষের  বিশেষ অনুমতি নিয়ে ঘুরে দেখা যায়  প্রকল্পটি। লকগেটের সেতু পেরোলেই ওপারে ওপাশে র‌য়্যাল  ভুটান রাষ্ট্র। পারপারের কোন বিধিনিষেধ নেই। চমৎকার পাহাড়, অরণ্য, নদী কমলালেবুর বাগান সব মিলিয়ে বেড়ানোর অপরূপ জায়গা উত্তরবঙ্গের বিন্দু।

 

কী ভাবে যাবেন: কলকাতা থেকে শিলিগুড়ি। শিলিগুড়ির বাসস্ট্যান্ড থেকে বাসে চালসা হয়ে জিপে বা রিজার্ভড গাড়িতে বিন্দু পৌছনো যায়।

থাকবেন: বিন্দুতে বাজারের কাছে থাকার জন্যে আছে  শিবাজ ট্যুরিস্ট ইন, গাহুনবাড়ি দ্রুকিউল রিট্রিট প্রভৃতি বেশ কিছু হোটেল ও লজ।

কখন যাবেন: নভেম্বর থেকে মার্চ ।

 

 


পাহাড়চুড়োয় দুর্গ

পাহাড়চুড়োয় দুর্গ

 

পাহাড়েরর চুড়োয় একফালি ইতিহাস। পরিত্যাক্ত দুর্গের ফাটল, মন্দিরের কারুকাজে গেছে রাজারাজড়ার  কাহিনি, দেবদেবতার অখ্যান। বেড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে ইতিহাস ছোঁয়ার রোমাঞ্চ এখানে ভ্রমণপ্রেমীর বাড়তি পাওনা।

 

দক্ষিণ ভারতের কর্নাটকের রাজধানী বেঙ্গালুরুর কাছাকাছি ‘দেবরায়ন দুর্গ’  টুমকুর জেলায় অবস্থিত  এই পাহাড়চুড়োর   টুরিস্ট স্পটটি সেই সব  পর্যটকের ভাল লাগবে, যারা পাহাড়  ও প্রাচীন  মন্দির ভালবাসেন।  আজ থেকে দশ বছর আগেও এই শহরটিকে বলা হত  ভারতের  ‘শীততাপ নিয়ন্ত্রিত শহর’ কারণ গ্রীষ্মকালেও এখানে মনোরম থাকতো।  সমুদ্রতল থেকে ৩০৫০ ফুট উচুতে অবস্থিত হওয়ায় শহরটির তাপমাত্রা  গরমের দিনেও অত বেশি হয় না।  যদিও এখন দ্রুত নগরায়ণ ও শিল্পায়নের জন্য  আবহাওয়ার অনেক পরিবর্তন হয়েছে।  তবে  ৪২০০ ফুট উচুতে অবস্থিত দেবরায়ান দুর্গ গ্রীষ্মকালে বেড়াবার পক্ষে আজও উপযুক্ত।

 

বেঙ্গালুরু-পুণে হাইওয়ে দিয়ে পঞ্চাশ কিমি গিয়ে ডোব্বাসপেট পৌছে ডান দিকে দেবরায়ন দুর্গের রাস্তা। এখান থেকেই পাহড়ে ওঠার রাস্তাটা দোক যায়। ছোট ছোট গ্রাম পেরিয়ে পাহাড়ের মাঝামাঝি এসে পৌছালে দেখা যায় চারদিক ঘন জঙ্গল ও পাথরে ঢাকা। দেবরায়ন দুর্গ পাহাড়ের  শুরু ওখান থেকেই।  সামনে দুটো রাস্তা চলে গিয়েছে।  বা দিকের রাস্তা গিয়েছে ভোগ নৃসিংহ মন্দিরের দিকে।  এই মন্দিরের ইতিহাস বলে যে ত্রেতা যুগে ইক্ষ্বাকু বংশের রাজা অম্বরিষ যখন এই পাহাড়ে তপস্যা শেষে উপবাস ভঙ্গ করার উদ্রেগ করে ছিলেন তখন সেখানে ঋষি দুর্বাসা এসে উপস্থিত হন ও রাজাকে বলেন যে, তিনি স্নান করে না আসা পর্যন্ত রাজা যেন অভুক্ত থাকেন। ‍ ক্ষুধা ও তৃষ্ণায় কাতর রাজা ঋষিকে ফিরতে না দেখে  এক গন্ডূষ জলে খেয়ে উপবাস ভঙ্গ করেন ও ঠিক সেই সময়েই সেখানে এসে উপস্থিত হন দুর্বাসা। ঋষি রাজাকে জল খেতে দেখে ক্রুদ্ধ হয়ে অভিশাপ দেন যে, বিষ্ণুর সুদর্শন চক্রে  তার  প্রাণ যাবে।  বলার সঙ্গে সঙ্গে সুদর্শন চক্র রাজাকে তাড়া করে।  নিজের প্রাণ বাচানোর জন্যে রাজা অম্বরিষ ভগবান বিষ্ণুকে স্তব করেন ও  বিষ্ণুর আদেশে সুদর্শন চক্রটি রাজাকে ছেড়ে  ঋকে তাড়া করতে শুরু করে।

 

ঋষি তখন বিষ্ণুর কাছ ক্ষমা চেয়ে নিলে সুদর্শন অদৃশ্য হয়।  ভগবান বিষ্ণু তখন ঋষিকে নৃসিংহরুপে দেখা দেন।  এই কারণেই এই মূর্তিটি প্রতিষ্ঠিত হয়।

 

ঐতিহাসিকদের মতে মন্দিরটি হাজার হাজার বছর আগেও ছিল।  চুতর্দশ শতেকে বিজয় নগরে সম্রাটরা এই মন্দিরটি পুনর্নির্মাণ করেন।  গর্ভগৃহের মধ্যে শ্রীনৃসিংহ বসে আছেন ও তার ডান কোলে দেবী লক্ষ্মী।  মন্দিরের  সামনের গোপুরমটি নির্মাণ করেন সপ্তদশ শতকে মহীশুরের রাজা চিক্কাদেব ওডোয়ার।  নৃসিংহদেবের মন্দিরের কাছেই রয়েছে লক্ষ্মীর মন্দির।  এই ঐতিহাসিক মন্দিরের পিছনে আছে মন্দিরের  পুষ্করিণী।  এখান থেকে অন্য চুড়োটি খুব সুন্দর দেখায়। ঠিক বাঁ দিকে একটু এগিয়ে হনুমান মন্দির। চতুর্দশ শতকে বিখ্যাত বৈষ্ণুব সাধক বদিরাজ মন্দিরটি নির্মাণ করেন।   পাহাড়ের সর্বোচ্চ চুড়ো, উচ্চতা হল ৩৭৫০ ফুট।  অনেক পাখি দেখা যায় এখানে। উল্লেখ্য বিরল হলুদ রঙের বুলবুল পাখি।  চারদিকের সৌন্দর্য বেশ মনোরম। কিছুটা পথ এগিয়েই পাথরের তৈরি এবড়োখেবড়ো একশ মিটার সিড়ি।  সিড়ি দিয়ে উঠে গেলে সামনেই দুর্গের দরজা।  ছোট্ট অথচ সুন্দর এই কেল্লাটি ইতিহাসে নিজের জায়গা করে নিয়েছে।   ত্রয়োদশ শতকে এই দুর্গটি তৈরি করেন স্থানীয় সামন্ত রাজা জাডাকা।  পরে ষোড়শ শতকে বিখ্যাত বিজয়নগর সম্রাট কৃষ্ণদেবরায় এই কেল্লা ও পাহাড়টি দখল করেন।  কেল্লাটিতে ছয়টি প্রবেশপথ আছে।  তবে এখন আর কেউ এর ভিতরে যায় না।  এর সামনে থেকে দেখা যায় পাহাড়ের শীর্ষে অবস্থিত যোগনৃসিংহ মন্দির।  কেল্লার ঠিক উল্টো দিকে পাথরের খোদিত হনুমান ও গরুড়ের সুন্দর মূর্তিটি।  কেল্লার ঠিক উল্টো পিছনেই মন্দিরটি।  পরিবেশ বেশ শান্ত ও সৌম্য।  মন্দিরের ঢোকার আগে ৪২০০ ফুট উচু পাহাড়চুড়োয় দাড়ালে দেখা যায় নীচের অভাবনীয়  সুন্দর উপত্যাকা। মন্দিরের  সামনে পুকুর। গুহরি মতো গর্ভগৃহে যোগাসনে বসে আছেন ভগবান নৃসিংহ। । এ ছাড়া  রয়েছে বৈষ্ণবসাধক রামানুজাচার্যর মুর্তি ও অন্যঅন্য সাধকেদের মূর্তি। ফেরার সময় পাহাড়ের নীচে দেখ যায় জয়ামঙ্গলী নদী । জয়া ও মঙ্গলী  নামক দুট দলধারা মিলে জয়ামঙ্গলী। ছোট্ট একটি গুহাতে রয়েছে রামের মূর্তি।  প্রচলিত কিংবদন্তী অনুসারে বনবাসের  সময় শ্রীরাম, সীতা ও লক্ষণের সঙ্গে এসেছিলেন।   কপলে তিলক পরার পর জন্যে  রাম তির দিয়ে পাথর কেটে জলধারা বের করেছিলেন সেই জলধারা এখনও বইছে।  এর নাম ’নমচিলুমে’ স্থানীয় ভাষায় ’নম’ মানে তিলক।  এখানকার সৌন্দর্য মনকে মুগ্ধ করবেই।

 

দেবরায়ান দুর্গ থেকে বার কিমি দূরে টুমকুর শহরের আশেপাশে রয়েছে অনেক পুরনো সুন্দর মন্দির, পাহাড়, গুহামন্দির, অভয়ারণ্য ও কেল্লা।  এই পাহাড়ের উল্টো দিকেই আছে দুর্গ সংরক্ষিত বন।  এখানে অনেক হরিণ, লেপার্ড, বাঘ অন্যান্য বন্য প্রাণীর দেখা পাওয়া যাবে।

 

কীভাবে যাবেন

বাংলাদেশ থেকে হাওড়া থেকে বেঙ্গালুরু যেতে পারেন-

  • যশবন্তপুর এক্সপ্রেস
  • গুয়াহাট-বেঙ্গালুরু এক্সপ্রেস
  • এ ছাড়া দমদম বিমানবন্দর থেকে প্লেনেও বেঙ্গলুরু যেতে পারেন।

বেঙ্গালুরু পৌছানোর পর-

  • বেঙ্গালুরু থেকে ষাট কিমি দূরে রয়েছে দেবরায়ান দূর্গ।  গাড়ি ভাড়া করে বা বেঙ্গালুরুর কেম্পেগোড়া বাস স্ট্যান্ড থেকে কর্নাটক রাজ্য সরকারের বাসে চড়েও দেবরায়ান দূর্গে যেতে পারেন।  সময় লাগবে দেড় ঘন্টা।

কোথায় থাকবেন

  • কর্নাটক পর্যটন দ্বারা পরিচালিত হোটেল ময়ূরা মেঘদূত। ভাড়া দৈনিক একশত পঞ্চাশ টাকা।
  • এছাড়া রয়েছে বনবিভাগের বাংলো

 


জাফলং: বুলডোজারের শব্দ

জাফলং: বুলডোজারের শব্দ

সিলেট থেকে  জাফলং বাজারের দুরুত্ব প্রায় ৬০ কিলোমিটার। শহর থেকে ২১ কি. মি. দূরে পেট্রোবাংলার বিশাল কমপ্লেক্স, অর্থ্যাৎ হরিপুরের গ্যাস ফিল্ড। রাতে ফেরার পথে কূপ থেকে আগুনের লেলিহান শিখা দেখা যায়। সিলেট শহর থেকে প্রায় ৩৭ কি. মি. দূরে সারীঘাট নামক এক স্থানে রয়েছে প্রাচীন এক পাণ্থশালা। প্রায় আড়াইশ বছর আগে জৈন্তা রাজা নির্মাণ করেছিলেন এই পান্থশালাটি। পাহাড়ের চূড়ায় পুরানো দালানটা অনেকটা এখনো আছে। তবে বড়ো বড়ো পাথরগুলো যা ক বছর আগেও দেখতে মানুষের ভীড় জমতো, সেগুলো আজ আর নেই।

একটু সামনে এগোলেই অর্থ্যাৎ ৪২ কি. মি. পথে জৈত্নেশ্বরী বাড়ী। এখানেই জৈন্তা রাজার রাজবাড়ী ছিল। রাজবাড়ীর প্রাচীরের গায়ে নানা বর্ণের চিত্র। রাজপ্রাসীদের সামনে স্বাধীন রাজার বিচার সভা বসতো বড়ো বড়ো পাথরের ওপর। বাড়ির আঙিনায় কুয়ার মতো বড়ো ঢাল ছিল্। কথিত আছে, এসব ঢালে রাজদ্রোহীদের নরবিল দেওয়া হতো।

তামাবিল সীমান্তের কাছে যতোই এগোনো যায় ততোই কালো পাহাড় আর সবুজের হাতছানি। মাঝে মধ্যে ঝরনার স্রোত। এতো ভাল লাগে যে, চিৎকার করে বলে উঠতে ইচ্ছে করে আমি পাহাড়টা ধরতে চাই। যদিও ঝরনা আর পাহাড় অনেক দূরে।

একটা ঝরনার সামনেই শ্রীপুর চা বাগান। পশ্চিম দিকে ব্যাক্তিমালাকানায় একটি পিকনিক স্পট। সবাইকে বারবার আসতে বলবে এর পরিবেশ আর পরিচ্ছন্নতা। পূর্ব দিকে যে পাহাড়টা আমাদের সীমান্তের ওপারে, ওটার পাদদেশে রয়েছে পাথর কোয়ারি আর চা বাগান। বাগানটা আছে খুবই অযত্নে। তবে পাথর কোয়াবিটা একটু দূর সীমান্তে। তামাবিল সীমান্তকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে ক্লিয়ারিং ফরোয়াডিং ব্যবসা। বিভিন্ন ইমপোর্ট এক্সপোর্টের মালামাল ডাহুকী ভ্যালি ব্রিজ ক্রস করে বাংলাদেশ সীমান্তে আসে। সীমান্তের ওপারে আমাদের বিডিআর ওপারে বিএসএফ এর ইমিগ্রেশন চেকপোষ্ট। এই চেকপোষ্ট দিয়ে মেঘালয় থেকে পন্যসামগ্রী আসে। তবে কয়লাটা আসে বড়ো বড়ো ট্রাক লরিতে।

তামাবিলকে ডানে রেখে নতুন রাস্তা দিয়ে একেবেকে চলে আসা যায় জাফলং। খোয়াই নদীর তীরে জাফলং বাজার। ক বছর আগেও এতোটা বড়ো বানিজ্য কেন্দ্র মনে হয়নি একে। এতো জনবসতিও গড়ে ওঠেনি। বাঙালি শ্রমিকদের আনাগোনাও ছিল খুবই কম। নদীর ওপর জীবনধারণ করতে আসে পুঞ্জির খাসিয়া জনগোষ্টী। আর এখন ওদের কে দেখা যায় শুধু পান সুপারি, আনারস বিক্রি করতে। অনেকে পাহাড়ী জীবনধারনকে বিসর্জন দিয়ে বাঙালি কালচারের সঙ্গে মিলেমিশে কাজ করছে। খোয়াই নদীর তীরে পাহাড়ের ব্যবসা এখন ভীষণ জমজমাট। স্থানীয় শ্রমিক বলতে তেমন কেউ নাই। কবছর আগেও খোয়াই নদীতে হাতে গোনা শখানেক নৌকা ছিল আর এখন প্রায় হাজার ছড়িয়ে গেছে। তার কারণ জাফলং এর খোয়াই নদীর বালি থেকে শুরু করে বড়ো বড়ে পাথর, এখানে ওখানে দেখা যায় বুল ডোজার। এখন সবটাই ব্যবসাভিত্তিক। বড়ো ব্যবসায়ীরা সাবকন্ট্রাক্টে শ্রমিকদের কাছ থেকে সিএফটি বা ঘনফুট হিসেবে পাথর কিনে থাকে। সকাল থেকে সন্ধ্যা ৬ টা পর্যন্ত খোয়াই নদীতে পাথর তোলা হয় বিভিন্ন পদ্ধতিতে। এবং ১০ বছরের বাবুলাল থেকে শুরু করে রংপুর থেকে আসা কছিমউদ্দিনও এখানে কাজের শ্রমিক। কাজ মানে শ্রম। ভীষণ কষ্টের শ্রম। ঠান্ডা পানিতে গা ভাসিয়ে সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্য্ন্ত মাঝারি আকারের এক সি এফটি পাথর সংগ্রহ করতে পারলে মজুরি জোটে ৬০ থেকে ৭০ টাকা। এর মধ্যে দুবেলার খাবার। খাবার খেতে চলে যায় ২০ টাকা। হাতে থাকে ৫০। শ্রমের তুলনায় এ্ই ৫০ টাকা নেহাতই কমই। অথচ বড়ো বড়ো কন্ট্রাক্টররা পাথর বোঝাই ট্রাকে তুলে নিয়ে যাচ্ছে ২৭ হাজার টাকা থেকে ৮০ হাজার টাকার পাথর। এসব পাথর আবার চড়া দামে সিলেট থেকে বার্জে করে ঢাকার গাবতলী ঘাটে কিংবা ফতুল্লা ঘাটে চলে আসে নদীপথে। চার পাঁচটা পাথর ভাঙার ক্রাসার মেশিন্ও এখানে চলে সারাদিন। বিকট আওয়াজের কারণে জাফলং অঞ্চলে কিংবা নদীতে নৌকা নিয়ে বেশিক্ষণ কেউ থাকতে পারে না। আবার ওদিকে সন্ধ্যার পর বিজিবি হুইসেল দিলে সব শ্রমজীবী মানুষকে সরে আসতে হয় সীমান্ত এলাকার পানি থেকে। তবে বর্ষার সময় কোথায় নোমন্স ওয়াটার তা বোঝা মুশকিল্ আর তাই বর্ষার সময়টাতে শ্রমিকরা কাজও করতে পারে না। কারণ প্রতিদিন পানি বাড়ে। পানি বাড়ালে ডুব দিয়ে পাথার তোলা সম্ভব নয়। এটা সম্ভব হয় শীতকালে।

তাই শীতকাল শ্রমজীবী মানুষের আনাগোনা বেশি। পর্যটকরাও আসেন। তবে পরিবেশ এখন অতোটা কাছে টানে না। পর্যটনের আমন্ত্রনে যে একবার যাবে, দুবার সে আর যেতে চাইবে না। কারণ জাফলং অঞ্চলে থাকার তেমন কোনো সুব্যবস্থা, হোটেল বা নিরাপত্তা কোনোটাই নেই। খোয়াই নদীর আর্কষণ এখন শ্রমজীবী মানুষের জীবনের আরেক মানচিত্র। আরেক জনপদ। প্রতিদিন ছেলে বউ স্বামী সবাই মিলেমিশে পাথর তোলে, তুলে ডিঙ্গি নৌকায় এপারে এনে জড়ো করে। আর সেখান থেকে নিয়ে যায় বড়ো ব্যবসায়ীরা। এসবের দিকে চোখ না ফিরিয়ে, দেখা যায় আরেকটি জিনিস। ওপারে খাসিয়া পুঞ্জি। খাসিয়া গ্রামে ঢুকলেই প্রচুর সুপারি গাছের সমাহার দেখা যাবে। গাছের সঙ্গে লেপ্টে আছে খাসিয়া বাগানের পান। ঝাল পান বলে বেশ সুনাম আছে এর। যদিও এখানে আর নীরবতা নেই। নেই ঘোরার মতো মনোরম পরিবেশ। তবু সুন্দর জাফলং এর দৃশ্যসকল দেখার মোহে এখনো শীতকালে হাজার হাজার মানুষ আসে এখানে।


মনোরম মিরিক (Mirik)

মনোরম মিরিক (Mirik)

 

ছোট অবকাশে জীবেনের মনোরম পরিবেশ পেতে চলে আসুন শৈলশহর মিরিকে।

 

ডুয়ার্সের তরাই অঞ্চল দিয়ে ট্রেন বা সড়ক পথে যেতে যেতে যখন কাছ নদী আগে তখন চোখের  সামনে বিশাল উপত্যকা খুলে যায় হঠাৎ করে।  সাদা নুড়ির বুক চিরে প্রাবাহিতা খড়স্রোতা নদীর পিছনে দেখা যায় জঙ্গল, তার ছিনে বলিষ্ঠ বাহাড়ের ভাঁজ।  আর তারও পিছনে নীল আকেশের গায়ে কদাচিৎ উঁকি মারে দুধসাদা শিখরের চুড়া কয়েক মুহুর্ত।  গাড়ি এগিয়ে যায়।  দেখিয়ে  যায় ঐশ্বর্যময়ী গিরিরাজেরনত্নখনির এক ঝলক। সেই রাজকোষের এক বহুমূল্য রত্নের মিরিক।  তার সৌন্দর্য একটু ভিন্ন স্বাদের , যার সহজ উপমা হিমালয়ের বর্ণনায় সচরাচর মেলে না । দার্জিলিংয়ের দক্ষিণ-পশ্চিমে সিঙ্গলীলা পাহাড়ের বুকে ১৭৬৭ মিটার উঁচুতে ছোট্ট উপত্যকা এই মিরিক- অর্থ আগুনে শহর।

 

যাত্রা শুরু করুন শিলিগুড়ি থেকে মিরিকের পথে।

 

তিন ঘন্টার বৈচিত্রময় পথ। শহর ছেড়ে বেরতেই আরম্ভ হয়ে যাব হালকা পাহাড়ি ঢাল। সে ঢালে ঢল এনেছে চা-বাগানের সারি। শ্যাডো ট্রি দিয়ে ছাওয়া কচি সবুজ ও গাঢ় সবুজ চা-বাগিচার আঙ্গিনায় চলছে মঘ ও রৌদ্রের খেলা।  প্রথমেই এল সুকনার বিশাল লাইফ স্যাংচুয়ারির অন্তর্গত।

 

এরপর গাড়ি পাহড়ি পথে উঠতে আরম্ভ করে। হিমালয়ের সৌন্দর্য এখানেই। ইউরোপ এ যে অ্যালপাইন বন ও বন্যপ্রাণীর স্বাদ পেতে অনেক পথ পাড়ি দিতে হয়, হিমালয়ে মাত্র দু-এক ঘন্টার সেই বৈচিত্রময় প্রকৃতির আস্বাদ পাইয়ে দেয়। গাড়ি উঠতে আরম্ভ করলে মুহুর্তে পিছনে ফেলে দেয় তিস্তার উপত্যকাকে। দূর থেকে দূরান্তের চলে যায় তিস্তা, দেখা যায় একট চকচেকে রেখার আকারে । মাঝে মাঝে তাও বিলিন হয় উন্নতশির হিমালয়ের অতল গহ্বরে।

 

উচ্চতা বাড়তে থাকে। আর রাড়ে ঠান্ডা। শাল, সেগুন উধাও হয়ে দেখা দেয় বার্চ, পাইন। পেরিয়ে যায় পাহাড়ি অঞ্চলের বড় বসতি ফুগুড়ি এ পথে দেখা যায় প্রচুর কমলালেবুর গাছ। তারপর আসে লাবণ্যময়ী সৌরিনী। মিরিক থেকে মাত্র আট কিলোমিটার দূরত্বের পাহাড়ি গ্রাম্য বসতি।  ছবির মতো সাজানো তার সৌন্দর্যকে বাড়িয়ে তোলে খাড়াই পাহাড়ের নয়নলোভা চা-বাগান।  কোথাও কোথাও ঢালের মাঝ ইতস্তত গ্রাম্য ঘরবাড়ি, সে এক ভিন্ন সৌন্দর্যের সৃষ্টি করে।  চার দিকে সৌরিনী টি এস্টেটের প্ল্যাকার্ড বাসানো।

চা-বাগিচা তো তরাইয়ের অল্প ঢালের ফসল।

 

অবশেষে মিরিক।   স্বর্গদ্বারের এক বিস্ময়কর ধাপ্ দার্জিলিংয়ের ভিড় এড়িয়ে শৈলসৌন্দর্য আস্বাদনে ১৯৭৯ তে নতুন করে গড়ে ওঠে এই হিল স্টেশণ।  মিরিকের মূল আকর্ষণ পাঁচ একরব্যাপী সমতলভূমী, আর তারই মাঝে প্রকৃতিদত্ত দীর্ঘ আঁকাবাকা মিরিক ঝিল বা সামেন্দু লেক।  ঝাউগাছর ফাঁক গলে কাঞ্চনজঙ্ঘার প্রতিফলন ঘটে ১.২৫ কিমি ব্যাপ্ত  লেকের জলে। মাঝে মাঝেই নেমে আসে মেঘের ভেলা এই বিশাল ঝিলের ওপরে।  ঢেকে ফেলে সম্পূর্ণভাবে। হিমালয়ের কোলে আরও অনেক ঝিল দেখেছি, তারা নির্জন প্রান্তে একাকিনী।  ন্তিু মিরিক লেককে ঘেরে মানুষ সাজিয়েছে তার বিনোদনের পসরা।  সেখান কেউ প্যাডল বোয়িং, স্পিড বোটিং করছে, তো কেউ গোড়ায় চলে ঘুরে বেড়াচ্ছে ঝিলের ধারে ধারে।  লেকের পাড়ে মনোহর বাগচা।  পাশে মাঠ । তার ধারে রেস্তরার সারি। কেউ সেখানে বসে খাচ্ছে আর লেকের শোভা দেখছে তো, কেউ জলের ধারে পাতা বেঞ্চিতে বসে অনমনা।  ঝিলের পাড় ঘেঁষা ঝাউবনের ছায়ায় হাঁটার পথ আছে – এতদম বিদেশের ফরেস্ট ট্রেকগুলোর মাতো।  চোখ তুলে চাইলেই চোখে পড়ে স্বর্ণতোরণে সাজানো এক বিশাল মনাস্ট্রি।  যেন শৈলশিখরে স্বর্ণপুরী্ খাকড়াই পাহাড়ি পথের সিড়ি ভেঙ্গে উঠুন বৌদ্ধ মনাস্ট্রির ঝলমলে আঙ্গিনায়। অপরুপ সাজসজ্জার অলঙ্করণ।  যোগ দিন প্রার্থনা সভায়।  পরে মনাস্ট্রির অলিন্দ থেকে চেয়ে দেখুন নিচে, মিরিক ঝিলের দিকে ঝাউবনে ঘেরা হিমালয়ে-হ্রদের অনন্য দৃশ্য আপনাকে মুগ্ধ করবেই।

 

মিরিকের মনোরম আবহাওয়ায় সব সময়ই ঘুরে বেড়াতে ভাল লাগবে। প্রায় বিশ হাজার লোকের বাস এখানে, গোরখাদের সংখ্যাই বেশি। দার্জিলিংয়ের কমলালেবুর সিংহভাগিই হচ্ছে এখানে।

 

মিরিক যাত্রীদের বড় আকর্ষণ এগার কিমি দূরের নেপালের পশুপতিনগর- বিদেশি পণ্যের সম্ভার নিয়ে পসরা সাজিয়েছেন দোকানি। অবশ্যই এখান থেকে কিছু কিনে আনতে ভুলবেন না।

 

চেকলিস্ট

 

কীভাবে যাবেন।

 

কলকাতা থেকে উত্তরবঙ্গ বাওয়ার যে কোনও ট্রেনে নিউ জলপাইগুড়ি চলে যান। অথবা বিমানে যান কলকাতা থেকে বাগডোগরা। শিলিগুড়ি থেকে মিরিকের দূরত্ব ৫২ কিমি।  নিউ জলপাইগুড়ি বা শিলিগুড়ি থেকে মিরিকের প্রচুর গাড়ি পাওয়া যায়। বুক করলে আসা যাওয়া এক হাজার টাকা মধ্যে পড়ে।   না হলে জন প্রতি পঞ্চাশ থেকে আশি টাকা।  দিনে দিন ঘুরে আসা যায়, আবার মিরিকে রাত্রিবাসও করা যায়।

 

কোথায় থাকবেন।

 

থাকার জন্যে মিরিক ঝিলক ঘিরে পচুর হোটেল, ডে সেন্টার ও লজ আছে।

 

কখন যাবেন।

 

বছরের যে কোনও সময় ঘুরতে যাওয়া যায়।

 

ট্যুর প্ল্যান

 

ঢাকা থেকে শিয়ালদহ থেকে রাতের দার্জিলিং মেলে উঠুন। সকালে পৌছে যান এনজিপিতে। এনজিপি বা শিলিগুড়ি থেকে মিরিক ঘন্টা তিনেকের পথ সেই দিন এবং পরের দুই দিন উপভোগ করুন মিরিকের সৌন্দর্য। মাঝে এক বেলার জন্য ঘুরে আসতে পারেন নেপালের পশুপতিনগর বাজার । ফিরুন একই ভাবে শিলিগুড়ি হয়ে কলকাতায় তারপর ঢাকায়। মোটমুটি পাঁচদিনের ছুটি নিলেই মিরিক ঘোরা সম্পূর্ণ।

 


Make booking here

Calendar is loading...
Powered by Booking Calendar

Subscribe Us

Enter your email address:

Delivered by Khaledrentacar

Skip to toolbar