Category Archives: travel

Driver Picks Up The Wrong Person At The Airport And It Ends With Police Officers Slamming His Head On The Ground

Category : travel

If you mistake a person at the bar, it usually ends with a few awkward phrases and everyone going about their ways. But if you’re a driver who’s supposed to pick up a person from the airport, these mix ups can lead to serious consequences. In the case of redditor u/Pmccully/, it ended with police officers slamming his head to the ground. Accidental kidnapping is no joke, even if there aren’t any bad intentions.

Image credits: omersukrugoksu (not the actual photo)

People had a lot to say about this


ভ্রমণকালে হাঁপানি রোগের সতর্কতা

Category : travel , ভ্রমণ

ভ্রমণকালে হাঁপানি রোগের সতর্কতা

শ্বাসকষ্ট বা হাঁপানি রোগ হবার যেমন কোন বয়স নেই তেমনি এটি শুরু হবারও নির্দিষ্ট কোন সময় নেই। যে কোন সময় যে কোন মানুষ এই রোগে আক্রান্ত হতে পারে। তাই হাঁপানি বা অ্যাজমা রোগীদের ভ্রমণকালে বিশেষ সর্তকর্তা অবলম্বণ করতে হবে। অ্যাজমা রোগীর বাস, ট্রাক, ট্রেন ও ট্যাক্সি ইত্যাদি পরিবহনের চলার সময় বিভিন্ন হাঁপানির উদ্রেককারী উৎপাদনের সম্মুখীন হয়। কারণ এস বাহনে থাকে এলার্জি সৃষ্টিকারী নানা রকম বস্তু। যেমন পরিবহনের বসার গদি,  কার্পেট ও বাইরের বাতাস আসা যাওয়ার জানালাগুলোতে জমে থাকা ধুলো এবং সবচেয়ে ক্ষতিকর ছত্রাক। সাধারণত সিগারেটের ধোয়া ও দুষিত বায়ু হাঁপানি রোগীর জন্য সবচেয়ে ক্ষতিকর। তাই এসব রোগীর ভ্রমণের সবচেয়ে উত্তম সময় হচ্ছে খুব ভোরে এবং রাতে। কারণ এ সময় বায়ু দুষণ কম হয়। অ্যাজমা রোগীদের ক্ষেত্রে দূরের পথ ভ্রমণের সময় শীততাপ নিয়ন্ত্রিত কক্ষে থাকাই শ্রেয়। যাদের শ্বাসকষ্টের পরিমাণ বেশি এবং যারা ইনহেলার ও নেবুলাইজার ব্যবহার করে থাকেন তাদের জন্য ইনহেলার ও বহনযোগ্র নেবুলাইজার ভ্রমণের সময় সঙ্গে রাখতে হবে। এছাড়াও রোগীরা  কোন বাহনে চলাচলের পূর্বে বাহনের দরজা বা জানালা বেশ কিছুক্ষণ সময় খুলে রাখলে ভাল। এতে করে পরিবহনে অ্যাজমা সৃষ্টিকারী এলার্জির পরিমাণ কিছুটা কমে যায়।

শ্বাসকষ্টের রোগীদের জন্য বিমান ও জাহাজে চলাচল করা কিছুটা নিরাপদ। কারণ আর্ন্তজাতিক বিমার রুটে

ভ্রমণকালে হাঁপানি রোগের সতর্কতা

ভ্রমণকালে হাঁপানি রোগের সতর্কতা

ধুমপান পুরোপুরি বর্জিত না হলেও অভ্যন্তরীন বিমানের ক্ষেত্রে ধুমপান সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করা হয়েছে। আর বর্তমানে জাহাজে ভ্রমনকারীদের জন্য বিভিন্ন স্বাস্থ্য ব্যবস্থা ও সুচিকিৎসার ব্যবস্থা করা হয়েছে। তথাপিও হাঁপানি রোগীদের জন্য বিমান চলাচলের ক্ষেত্রে ক্ষতিকর দিক হচ্ছে বিমানের অভ্যান্তরীন বায়ু। বিমানে ভ্রমণের সময় অ্যাজমা রোগীদের উপদেশ হাঁপানি রোগীর যদি কোন খাবারে এলার্জি থাকে তবে তাকে বিমানের খাদ্য গ্রহণের পূর্বেই সতর্ক হতে হবে। আমরা যতটুকু জানি, বিমানের খাদ্য সাধারনত আসে বিভিন্ন সরবারহকারী ঠিকাদার প্রতিষ্ঠান হতে। তাই এ সকল খাবার কী কী উপাদান দ্বারা  তৈরি তা জানা সম্ভব নয়। বিমানের খাদ্যর এলার্জি থেকে বাঁচতে রোগীকে সাথে এন্টি এলার্জিক ইনজেকশান রাখতে হবে। বিমান কর্তৃপক্ষের সাথে আগে থেকেই আলাপ আলোচনা করতে হবে যাতে রোগীর প্রয়োজনের সময় পর্যাপ্ত পরিমাণে অক্সিজেন সরবরাহ করা হয়। বিমানের ভিতরের বায়ু খুবই শুষ্ক। রোগীর নাকের ভেতরের অংশ আদ্র বা নরম রাখার জন্য নাকে ১ ঘন্টা পর পর স্যালাইন স্প্রে করতে হবে। যে সকল অ্যাজমা রোগীদের সাইনোসাইটিস ও কানের সমস্যা রয়েছে তারা বিমানে ভ্রমণের সময় অত্যাধিক যন্ত্রণা ভোগ করতে পারেন। সেক্ষেত্রে তারা প্রদাহ বিরোধী স্প্রে করতে পারেন। জাহাজে চলাচলকালে হাঁপানি রোগীদের জন্য পরামর্শ জাহাজে ভ্রমণের সময় শ্বাসকষ্টের রোগীরেদ সাথে করে এপিনেফ্রেনি ইনজেকশন রাখতে হবে। এ ক্ষেত্রে হাঁপানি রোগীদের যে ব্যাপারে সবচেয়ে বেশি খেয়াল রাখতে হবে তা হল জাহাজে যাত্রীদের জন্য সুচিকিৎসা স্বাস্থ্যসেবা পর্যাপ্ত কিনা।

পরজীবী ও ছত্রাক দ্বারা দুষিত ধুলোর কারণে এলার্জিজনিত অ্যাজমার প্রকোপ বাড়ে। আর এই ধুলো মিশে থাকে ঠান্ডা বা স্যাঁতস্যাঁতে আবহাওয়ায়। জাহাজে ভ্রমণকালে যাত্রীদের বিভিন্ন জলবায়ু ও আবহাওয়ার সম্মুখীণ হতে হয়, সেক্ষেত্রে অ্যাজমা রোগীদের সাবধান থাকতে হবে। এছাড়া উষ্ণ ও আদ্র আবহাওয়া থেকেও রোগীদের সতর্ক থাকতে হবে। কারণ এতে থাকে বায়ুবাহিত ছত্রাক, ফুলের রেণু ও পরজীবি।

অ্যাজমা রোগীর ভ্রমণকালে যে স্থানে থাকবে সে স্থান সম্পর্কে সাবধানতা

ভ্রমণের সময় বেশির ভাগ মানুষকেই হোটেল থাকতে হয়। সেক্ষেত্রে হাঁপানি রোগীকে এলার্জি গ্রুফ কক্ষে থাকতে হবে। এতে করে রোগী অ্যাজার প্র্রকোপ বৃদ্ধিকারী অ্যালার্জেনসমূহ যেমন- ঘরের মাদুর,  কার্পেট, পাপোষ জমে থাকা ধুলোবালি, ছত্রাক ও মাইট নামক অর্থোপৎ জীব থেকে বাচতে পারে। কর্তৃপক্ষকে আগে থেকেই সর্তক করতে হবে যাতে ঘরে বিড়াল বা ইঁদুর প্রবেশ করতে না পারে। কক্ষের চাদর ও বালিশ নিজেরা নিয়ে গেলে ভাল হয়। ঘরের যাতে পর্যাপ্ত রৌদ্র প্রবেশ করতে পারে সেদিকে  লক্ষ্য রাখতে হবে। সুইমিংপুল থেকে দূরে হাকা ভাল। ঘরে প্রবেশের পুর্বে এর দরজা জানালা কিছুক্ষণের জন্য খুলে রাখলে ভাল।

এছাড়াও হাঁপানী রোগীদের কারও বাড়িতে ভ্রমণের পূর্বে লক্ষ্য রাখতে হবে সে বাড়িতে পোষা প্রাণী আছে কিনা ? কারণ পোষা প্রাণীদের লোম, লালা ও প্রস্রাবে থাকে প্রচুর ছত্রাক। যা কিনা অ্যাজমা রোগীদের জন্য খুবই মারাত্মক। এ জাতীয় রোগীদের বিশেষ বিশেষ অনুষ্ঠানের খাবার  এড়িয়ে চলতে পারলে ভাল। কারণ এ সকল খাদ্য বিভিন্ন আলার্জি সৃষ্টিকারী উপাদান দ্বারা তৈরি হতে পারে। এছাড়াও অ্যাজমা বা হাঁপানি রোগীদের খেলাধুলা, ক্যাম্পিং কিং ইত্যাদি বিভিন্ন রকম বিষয় বা শ্বাসকষ্টের প্রকোপ বাড়াতে পারে সে সকল বিষয়    এড়িয়ে চলতে হবে। কারণ বেশি  রৌদ্রের ফলেও অ্যাজমা বেড়ে যেতে পারে। সর্বোপরি, অ্যাজমা বা হাঁপানি রোগীদের ভ্রমণ কালে তাদের প্রয়োজণীয় ওষুধ এন্টিহিস্টামিন,  ব্রংকোডাইলেটর, নিজে পুশ করার মত এপিনেফ্রিন ইনজেকশন এবং কর্টিকোষ্টেরোড সঙ্গে রাখতে হবে। ওষুধগুলো এমন জায়গায় রাখতে হবে যাতে প্রয়োজনের সময় খুব দ্রুত সেগুলো পাওয়া যায়। নিজের দেশ ছেড়ে অন্য কোন দেশে গেলে সেক্ষেত্রে পোর্টেবল নেবুলাইজার নিতে হবে। ওষুধ কেবল সঙ্গে নিলেই হবে না, সেগুলো নিয়ম করে সেবন করতে হবে। কোন অ্যাজমা রোগী যদি নিশ্চিন্তে ভ্রমণ করতে চান, তবে তার জন্য  সবচেয়ে শ্রেয় হবে ভ্রমণের পূর্বে অ্যাজমা বা এলার্জি বিশেষজ্ঞের নিকট হতে সঠিক পরামর্শ গ্রহণ করা। এতে করে হাঁপানিতে আক্রান্ত ভ্রমণকারীর যাত্রা হবে সুনিশ্চিত ও আনন্দদায়ক।

 

অধ্যাপক ডা. এ কে এম মোস্তফা হোসেন

বক্ষ্যব্যাধি বিশেষজ্ঞ


আংকর ভাট – Angkor Wat

Category : travel , ভ্রমণ

আংকর ভাট – Angkor Wat

এশিয়ার ঐতিহ্যের মুকুট মনি

কাজী আনিস উদ্দিন ইকবাল

 

কাম্পুচিয়ার নাম দীর্ঘমেয়াদী রক্তক্ষয়ী গৃহযুদ্ধের কারণে আমাদের অপরিচিত নয়। আদর্শবাদের নামে বিংশ শতাব্দীর বর্বরতম নৃশংসতার জন্যে এই দেশটি কিলিং ফিল্ড হিসাবে সারা বিশ্বে একদিকে ঘৃণা অন্যদিকে সহানুভুতির সঞ্চারক। কিন্তু এই দেশটির অতীতে স্থাপত্য ও শিল্পকলার চর্চার যে বিষ্ময়কর ঐতিহ্য রয়েছে তা মাথার খুলির মিউজিয়াম এবং অত্যাচারের জেল কুঠুরিগুলো যেখানে বাঙ্গালি কুটনীতিকেরও জীবন দিতে হয়েছে, তা দেখলে বিশ্বাস হতে চায় না। যেই যুগে ভারতে হিন্দু এবং বৌদ্ধ মতানুসারীরা একে অপরকে নিধন করছে, সে সময়ে কাম্পুচিয়ায় ওরার মিলে মিশে অবিশ্বাস্য সব বিশাল বিশাল মন্দির, স্তুপ গড়ে তুলেছে। ধর্ম, শিক্ষা ও সংস্কৃতিতে উন্নত ভারতীয়রা এক কালে বিনা রক্তপাতে জয় করেছিল  দক্ষিণ ও দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ার দেশগুলির মানুষের হৃদয় যার প্রমাণ হিসাবে এ অঞ্চলে হিন্দু ও বৌদ্ধ ধর্ম মতবাদের প্রচার ও স্থায়ীত্বকে গ্রহণ করা যায়। কোন সমাজের কোন একটি সামাজিক বৈশিষ্ট্য রাতারাতি যেমন গড়ে ওঠেনা, তেমনি হঠ্যাৎ করে বিলীনও হয়ে যায় না। এ ধরনের বৈশিষ্ট্যগুলির মূল কাঠামো হারিয়ে গেলে বা কার্যকারিতা ফুরিয়ে গেলেও তার ছাপ রয়ে যায়, ভাষায়, শিল্প সাহিত্যে, স্থাপত্যে, বাড়ী ঘরে  এবং নানা লোকাচারে। জাতির ইতিহাসে যদি গর্ব করার মত কিছু থাকে তাহলে তাকে জানবার ও জানাবার প্রয়োজন রয়েছে। বিষয়টি যুদ্ধ উপদ্রুত কাম্পুচিয়ার জনগন বুঝতে পারলেও আমরা বাঙ্গালীরা বুঝিনা। প্রাচীন ভারতের অংশ হিসাবে আমরাও সকল ঐতিহাসিক গৌরবের অংশীদার অথচ আমরা যেন কত তাড়াতাড়ি ওসব কথা ভুলে যেতে পারি সে চেষ্টায় আছি।

কাম্পুচিয়ার বেশিরভাগ অংশই কিন্তু সমতল ভুমি এবং এর অনেকাংশেই বর্ষাকালে পানি জমে। বর্ষাকাল আমাদের দেশের মতই, জুন থেকে শুরু হয়। মেকং ছাড়াও পানির উৎস হিসাবে টনলে স্যাপ হ্রদ বা সরোবার কিন্তু বেশ বড় এবং ভরা বর্ষায় এর চারদিক ছাপিয়ে এর আকার চারগুণ বেড়ে যায়। পানি নামলে নীচু জমিতে ফসল চাষ চলে। বৃষ্টি, হ্রৃদ, নদী, খাল বিল এক কথায় পানি কাম্পুচিয়ার কৃষি নির্ভর সমাজে বিশেষ তাৎপর্য বহন করে। আমাদের আলোচ্য প্রাচীন অংকর নগরীর ( Angkor Wat ) পরিকল্পনায় পানির ব্যবহারের একটা দক্ষ ব্যবস্থাপনা লক্ষ্য করা যায়।

দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ার বেশিরভাগ দেশ সভ্যতার আলো দেখতে পেয়েছিল ভারতের কাছ থেকে। বার্মা থেকে  ইন্দোনেশিয়া এসব অঞ্চলের সাথে চীন দেশের যোগাযোগ থাকলেও, চীনের অভিজাত শ্রেণী ওদের মানুষ মনে করেনি, কিন্তু বর্ণভেদে বিভক্ত ভারতীয়রা কিভাবে ওদের কাছে জনপ্রিয় হল এমনকি নিজেদের ছোট ছোট স্থানীয় ধর্মমত বির্সজন দিয়ে ‍হিন্দুত্ব বা বৌদ্ধ মতবাদ  গ্রহণ করল তা গবেষণার দাবী রাখে। শোনা যায় বাঙ্গালী ধর্ম পন্ডিত অতীশ দীপংকর গিয়েছিলেন বার্মায় ( পাগান) ধর্ম শিক্ষা দিতে। হয়ত কোন একদিন গবেষকরা এও বলে দিতে পারবেন আরও কত বাঙ্গালী ওসব দেশে গিয়ে রান্না শিখিয়েছে,  ইট গাথতে শিখিয়েছে। ভাষা হিসাবে সংস্কৃত এসব অঞ্চলে কি মর্যাদা পেয়েছে তা ইন্দোনেশিয়ার প্রধানমন্ত্রী ‘মেঘবতী সুকর্ণপুত্রী’র নামটি লক্ষ্য করলেই বোঝা যাবে।

আজকের কাম্পুচিয়া যাকে এখনও আমরা কম্বোডিয়া বলে চিনি, তার ইতিহাস জানতে হলে অবস্থানগত বিষয়গুলি বোঝা দরকার। দক্ষিণ পূর্ব  এশিয়ার অন্যতম দীর্ঘ নদী মেকং, যার উৎপত্তি তিব্বতে এবং চীন, লাওস হয়ে কাম্পুচিয়ার বুক চীরে ভিয়েতনামের দক্ষিণাংশ ভেদ করে সমুদ্রে গিয়ে মিশেছে। কাম্পুচিয়ার সমতল ভুমির বেশিরভাগই এই মেকং নদীর দুই পাশে। পশ্চিম ও উত্তর পশ্চিম পাহাড়ী এলাকা। এই পাহাড়ী এলাকার বিভিন্ন ঝর্ণা থেকে টানলে স্যাপ’ নামে একটা সরোবর সৃষ্টি হয়েছে, তা থেকেই ‘টনলে স্যাপ’ নদী। এই নদী তুলনায় ছোট হলেও দক্ষিণ ভিয়েতনাম হয়ে চীন সাগরে শেষ হয়েছে। আমাদের আংকর নগরী উত্তর পশ্চিম এই পাহাড়ী এলাকার মাঝখানে একটা উচু সমতল ভুমিতে অবস্থিত। আংকর এলাকার কিছুটা দক্ষিণেই ‘টানলে স্যাপ’ সরোবর।

ইতিহাসের পাতা

কাম্পুচিয়ার মানুষের বসতির চিহ্ন গবেষকরা ( ৬০০০) ছয় হাজার বছর আগেও ছিল বলে প্রমাণ পেয়েছেন। এই মানুষের জাতি, বর্ণ নির্ণয় না করা গেলেও তারা যে মূলতঃ কৃষিজীবি চিল সে সমন্ধে সকলে নিশ্চিত। কয়েকটি প্রত্নতাত্বিক আবিষ্কারের মধ্যে দিয়ে জানা গেছে ঐ জনগোষ্টী সেই গুহা থেকে ধাপে ধাপে গ্রাম ভিত্তিক জীবন যাপনে অভ্যস্থ হয়েছিল। এই জনগোষ্টীর ধারাবাহিকতার চিহ্ন ১০০ খৃষ্টাব্দ পর্যন্ত পাওয়া গেছে।

সমসাময়িক কালে চীন এবং ভারতবর্ষ ছিল রীতিমত উন্নত সমৃদ্ধ দেশ। চীন দেশের সাথে ভারতবর্ষের পাহাড়ী স্থল পথে যে বানিজ্য ছিল সে পথগুলি প্রায়শঃ বর্বর যাযাবর উপজাতীগুলোর আক্রমণে বিপদ সংকুল হয়ে উঠেছিল। উভয় অঞ্চলের বণিকরা নৌপথে যোগাযোগের একটা পথ খোজ করছিল, চীনা পরিব্রাজকদের ভাষায় ‘দক্ষিণের সমুদ্র উপকুলের বর্বরদের দেশের’ মধ্য দিয়ে একটা পথের সম্ভাব্যতা যাচাই চলছিল। এ সময়ে ভারতবর্ষের পূর্বাঞ্চলের উপকুল থেকে ময়ুরপঙ্খী নাও সাজিয়ে নাবিকরা যাত্রা করলেন চীনের উদ্দেশ্যে। রূপকথার মতা শোনালেও একথা সত্যি ভারতীয়রা বঙ্গোপসাগরের উপকুল ঘেষে চলতে চলতে বর্তমান বার্মা থেকে শুরু করে কাম্পুচিয়া, ভিয়েতনাম, মালেশিয়া, ইন্দোনেশিয়ার দ্বীপপুঞ্জে পৌছে গেল। ধারণা করা যায় আমাদের বাংলাদেশের উপকুলীয় অঞ্চলের লোকেরাও  এই সব অভিযানে অংশগ্রহণ করেছিল। এসব এলাকার জনঘনত্ব যেমন কম ছিল, তেমনি তাদের অনুন্নত জীবন যাত্রা, ধর্ম ও অন্যান্য লোকচারের সীমাবদ্ধতার বিপরীতে ভারত থেকে আগত এসব অভিযাত্রীদের জ্ঞান, প্রযুক্তি এব শিক্ষা সংস্কৃতি ছিল অনেক অগ্রসর। উল্লেখ্য ভারতীয়রা এখানে যুদ্ধ করতে আসেনি, এসেছে ব্যবসার পথ খুজতে, এসব অভিযাত্রী সওদাগররা ছিল নমনীয়, তারা স্থানীয় জনসাধারণের সাথে সখ্যতা গড়ে তুলতে আগ্রহী, নিজেদের বাজার সৃষ্টির তাগিদে ভারতীয় সংস্কৃতির উন্নত দিকগুলি এরা ছড়িয়ে দিতে উদ্যোগী হন। সবচেয়ে সফলতা পায় সংস্কৃত ভাষা এবং হিন্দু ধর্ম। বর্ণাশ্রয়ী হিন্দু ধর্মের কঠোর নিয়ম কানুন শিথিল ভাবে উপস্থাপন করে তারা স্থানীয় মেয়েদের সাথে সংসার পেতে বসে। যখন ভারতীয়রা পাকাপোক্ত আসন তৈরী করে ফেলেছে, তখনও চীনারা এদের বর্বর বলে দুরে সরিয়ে রাখল। তবে সংস্কৃত ভাষার গ্রহণযোগ্যতা ছিল অমোঘ, কারণ তৎকালীন বিশ্বের সবচেয়ে উন্নত ভাষাগুলির  একটি হল সংস্কৃত। তাই রাজ দরবারের ভাষা হিসাবে স্বীকৃত পেল সংস্কৃত। রাজতন্ত্র সহায়ক হিন্দু ধর্মীয় প্রথাগুলি স্থানীয় রাজাদের কাছে অধীক উপযোগী মনে হওয়ায় ওরা হিন্দুত্ব বরণ করে দেবতাকুলের সাথে অতি সত্বর যোগাযোগ স্থাপন করে ফেলল। পরবর্তী কালে ভারতবর্ষের আরেক প্রভাবশালী দর্শন বৌদ্ধ ধর্ম ও এসব অঞ্চলে একচ্ছত্র জনপ্রিয়তা লাভ করে। আরও পরে ভারতবর্ষের মতই ইসলাম ধর্ম বৌদ্ধ ধর্মে স্থান অধীকার করে, বিশেষতঃ মালেয়েশিয়া এবং ইন্দোনেশিয়ার। ভারতীয়দের এই সাংস্কৃতিক বিজয়ের একটা রূপকথা প্রচলিত আছে, ভারতের এক রাজপুত্র ( কৌদিন্য) কম্বোজ ( কাম্পুচিয়া) দেশে বানিজ্যে এলেন। রাজপুত্রদের যা হয়, ব্যবসায় মন নেই, নাগরাজ কন্যা সোমার প্রেমে পড়ে গেলেন এবং নানা নাটকের পর তাদের মিলন হল। নাগরাজ জলাভুমির জল শুষে নিয়ে একটা বিশাল রাজ্য বের করে কন্যা জামাতকে উপহার দিলেন। সেই হল কম্বোজ দেশ বা আজকের কাম্পুচিয়া। কিছু কিছু ঐতিহাসিক কৌদিন্যের বংশের ঠিকুজিও খুজে বের করে জানাচ্ছেন, কৌদিন্য দক্ষিণ ভারতের চোল রাজবংশের কোন রাজপুত্র হতে পারে। আর নাগকন্যা সোমা ? সে কিন কোন সাপুড়ের মেয়ে ? কে জানে, তবে কোন রাজবংশের উপাধী নাগ হতে পারে, নাগ উপাধী এদেশের হিন্দুদের মধ্যেও পাওয়া যায়। তবে এ কাহিনী ইঙ্গিত দিচ্ছে যে ভারতীয়রা সমাদরের ( জামাই আদরে) সাথেই স্থানীয় জনগনের কাছে গৃহীত হয়েছিল।

আগেই বলেছি দক্ষিণ পুর্ব  এশিয়ার এই দেশগুলিতে ভাষা, সংস্কৃতি এবং ধর্মের উপর ভারতীয় প্রভাব তাদেরকে ওই সময়ে অনেক অগ্রসর করে দিয়েছে। ছোট ছোট গোত্রে বিভক্ত হয়ে, নদীর পাড় ঘেষে যে কৃষিজীবি সমাজ ছিল, একে অপরের মধ্যে কলহ হতো, তা সে ঐ লুটপাট পর্যন্ত, কিন্তু দখল করে রাজ্য বিস্তার, শাসন, বিভিন্ন গোত্রের মধ্যে সমন্বয় করে একটা জাতির উদ্ভব হওয়া, এগুলো ভারতীয়দের কাছ থেকে দিক্ষা নেওয়ার ফল। কৌটেল্যের অর্থ শাস্ত্রে আছে, রাজ চক্রবর্তী বা মহারাজার কর্তব্য একটা নব ধর্ম চালু করা’। রাজ ধর্ম হিসাবে হিন্দুমত ভারতে যুগ যুগ ধরে কার্যকারিতা প্রমান করেছে। এ অঞ্চলের নব্য রাজার বংশানুক্রমিক ভাবে প্রজাদের মাঝে নিজেদের রাজ ভাবমূর্তি প্রতিষ্ঠার এমন মন্ত্র আগ্রহের সাথেই গ্রহণ করেছেন। কিন্তু ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা দ্বীপপুঞ্জ এবং মূলভুমি একই সাথে অগ্রসর হয়নি। উপরের চার্টটি দেখলে এ অঞ্চলের অন্যান্য প্রাচীন রাজ্যগুলি সম্বন্ধে ধারণা স্পষ্টতর হবে বলে মনে করি।

অংকর যারা গড়েছেন সেই রাজ বংশ এবং তাদের শাসনকাল সবহ খেমার নামে অভিহিত। খেমার রুজ গেরিলা যোদ্ধাদের নামটি মনে হয় সেই অতীত ঐতিহ্যকে স্মরণ করিয়ে দেবার জন্য গ্রহণ করা হয়েছিল। পাথর খোদাই করে সে কালের মানুষেরা জানানোর চেষ্টা করেছেন, ভগবান শিব নিজে কাম্বু স্বয়ম্ভুবা নামে জনৈক মনীঋষি যিনি কাম্বুজদেশের সকল অধিবাসীর আদি পিতা, তাকে মেরা নামের এক স্বর্গীয় অপ্সরীর সাথে বিবাহ দেন। সেই কাম্বু এবং মেরা নাকি খেমার রাজাদের পূর্ব পুরুষ। এর আগে কৌদিন্য এবং সোমার গল্প বলেছি, তবে ঐতিহাসিকরা বলেছেন এই রাজবংশের প্রতিষ্ঠাতা হলেন ২য় জয়বর্মন। তৎকালীন জনৈক আরব বনিকের লেখা থেকে জানা যাচ্ছে যে, শৈলেন্দ্র রাজা হঠ্যাৎ আক্রমণ করে এখানকার তরুন রাজাকে ( রাজেন্দ্র বর্মণের ছেলে) হত্যা এবং রাজ্য দখল করে। অনেক বন্দী সাথে এই জয়বর্মনও শৈলেন্দ্র রাজ্যের দরবারে নীত হয়েছিলেন ( এছাড়া ২য় জয়বর্মনের আর কোন ঠিকুজি মেলেনি এবং নামের সাথে বর্মন যুক্ত থাকায় রাজবংশের সাথে আত্মীয়তার সম্ভাবনা ধরে নেয় যায়)। ২য় জয়বর্মন ইন্দোনেশিয়া থেকে ফিরে  এসে দেশকে মুক্ত খেমার রাজ্য প্রতিষ্টা করলেন। তার রাজত্ব কাল ছিল ৮০২-৫০ খৃষ্টাব্দ। প্রথমে হরিহরালয় ( বর্তমানে যাকে রুলুস বলা হয়) পরে মহেন্দ্র পর্বত ( বর্তমান নমকুলেন ) ছিল তার রাজধানী। নম অর্থ পর্বত, নমকুলেনে এসে তিনি নিজেকে দুনিয়ার রাজা বলে দাবী করে বসলেন এবং নব ধর্ম পথ বাতলে দিলেন, এখন তিনি হলেন দেব রাজা অর্থ্যাৎ তিনি রাজাও আবার দেবতাও। কিন্তু দেব রাজা অমর হতে পারলেন না এবং ৮৫০ খৃষ্টাব্দে লোকান্তুরিত হলেন। পাথরের গায়ে খোদাই করা বিভিন্ন লেখা থেকে ২য় জয়বর্মণের বংশ তালিকায় ৩৯ জন রাজার নাম মিলেছে। ১ম ইন্দ্রবর্মন ( ৮৭৭-৮৯) পাহাড় সদৃশ মন্দির বাকং, পুর্ব পুরুষদের উদ্দেশ্যে নিবেদন, প্রিয়াহ কো মন্দির নির্মাণ এবং ইন্দ্রততক নামে দিঘী খনন করান। এর পর থেকে এই বংশের রাজাদের মধ্যে পুর্ব সুরীদের চেয়ে বড় কিছু নির্মাণ করার একটা ধারা লক্ষ্য করা যায়। ওর ছেলে যশবর্মণ (৮৮৯- ৯০০) বাবার খনন করা দিঘির মাঝ খানে পূর্ব পুরুষদের উদ্দেম্যে নিবেন করলেন লোলেই নামে এক মন্দির। এই যশবর্মনই তার রাজধানী নম কুলেন থেকে যশোধরাপুরে  ( বর্তমান আংকর) স্থানান্তরিত করেন। সেই শুরু হল আংকারের উত্থান  এবং পরবর্তী ৫০০ বছর ধরে খেমার রাজাদের প্রধান হিসেবে আংকর টিকে রইল। এই দীর্ঘ সময়ের মধ্যে দুয়েকজন খেমার রাজা অন্যান্য স্থানে রাজধানী নির্মাণের চেষ্টা করলেও তা নানা কারণে স্থায়ী হয়নি। ১ম যশবর্মণের দুই পুত্র পর পর রাজা হয়েছিলেন তারপর গণেশ উল্টে (বিদ্রোহের মাধ্যমে) এই বংশের চতুর্থ জয়বর্মন ( ৯২৮- ৯৪৪) রাজা হলেন। এই ভদ্রলোক রাজধানী আংকরের উত্তর পূর্বে কোহ করে এ স্থানান্তরীত করেছিলেন কিন্তু তার ভাগনা ২য় রাজেন্দ্রবর্মন আবার যশেধরপুরে (আংকর) তা ফেরত নিয়ে আসেন। রাজেন্দ্রবর্মন পুর্ব মেবন এবং প্রিরূপ এই ‍দুটি মন্দির নির্মান করেন। তিনি আবার চম্পা  দেশ আক্রমণও করেছিলেন। ওর ছেলে ৫ম জয়বর্মন শাসন করেছেন ৯৬৮ থেকে ১০০০ খৃষ্টাব্দ অবধি এবং তিনি বান্টি শ্রেয়ী মন্দির ( গুরুর উদ্দেশ্যে নিবেদিত) এবং টা কিও নামের মন্দির প্রতিষ্ঠা করেন। বান্টি শ্রেয়ীকে বলা হয় মহিলাদের মন্দির এবং রিলিফ ভাষ্কর্যের নৈপুন্যের দিক থেকে খেমার রাজ্যের আর কোন  ইমারতই এর সমকক্ষ নয়। এর পর রাজা হলেন ১ম সূর্যবর্মন ( ১০০২- ৫০) , তার সময়েই খেমার রাজ্য সবচেয়ে বেশি বিস্তার লাভ করে, তিনি থাইল্যান্ডের মধ্যে ও দক্ষিণাঞ্চল করায়ত্ত করেন। তারপর উল্লেখযোগ্য রাজা হলেন ২য় সূর্যবর্মন, যার নামের সাথে বিশ্বের অন্যতম আশ্চর্য ভবন ‘আংকর ভাট মন্দির’  নির্মাণের গৌরব গাথা জড়িত। ২য় সুর্যবর্মন যেমন বিষ্ময়কর নির্মাতা ছিলেন তেমনই রাজনীতিবিদ এবং সেনাপতিও ছিলেন,  তিনি চিনের সূং রাজাদের সাথে সখ্য গড়ার উদ্যোগ নেন এবং তার সেনাবাহিনী চম্পা রাজ্য আক্রমণ করে তছনছ করে এবং যথেচ্ছ লুন্ঠন চালায়। বলাই বাহুল্য নৃশংসতা ও নিষ্ঠুরতা সবসময়ই  বিজয়ীর মুকুটের মণি হিসাবে শোভা পেয়েছে। চম্পা রাজারাই বা তা মেনে নেবে কেন ? তৎকালীন চম্পা বর্তমান ভিয়েতনামের মানুষ যে প্রতিরোধ করতে জানে তা নিকট অতীতের মার্কিণ যুক্তরাষ্ট্রের পরাজয়ের ইতিহাসের দিকে তাকালেই স্পষ্ট হবে। ইতিহাস বলছে, চম্পারা ১১৭৭ খৃষ্টাব্দে মেকং নদীর উজানে সুকৌশলে এক অতর্কীত আক্রমণের মাধ্যমে আংকর দখল করে এবং পুড়িয়ে দেয়। খেমারদের ইতিহাসে চরমতম পরাজয়। এরপর চার বছল চম্পাদের অধীকারে ছিল আংকর। ৭ম জয়বর্মন ১১৮১ খৃষ্টাব্দে রাজ্য পূনরুদ্ধার করলেন। জয়বর্মন জাতিকে পূর্বের পরাজয়ের গ্লানি  ভোলাতে ১১৯০ সালে আবার চম্পা আক্রমণ করে রাজ্য ভুক্ত করেন এবং ওদের রাজাকে বেধে নিয়ে আসেন আংকারে। ৭ম জয়বর্মন ৫৫ বছর বয়সে ক্ষমতা গ্রহণ করেন এবং ৪০ বছর রাজত্ব করেছেন। তারা এই সুদীর্ঘ রাজত্ব কালে রাজ্য সীমা ভিয়েতনাম, বার্মা ( তৎকালীন পাগান), মালয় উপকুলীয় এলাকা পর্যন্ত বিস্তারিত ছিল। এই জয়বর্মন মহাযান ‍বুদ্ধ ধর্ম মতের অনুসারী ছিলেন এবং এই ধর্ম মতকে প্রতিষ্ঠা দেবার জন্য তিনি বিখ্যাত বাইয়ন সহ অনেক বৌদ্ধ মন্দির ও স্তুপ নির্মাণ করেন। নির্মাতা হিসাবে তিনি এক হিসাবে খেমার রাজাদের মধ্যে সর্বোচ্চ আসন অধীকার করে আছেন। বলা হয় থাকে তার সময়ে যত মন্দির, স্তুপ, সৌধ, প্রসাদ, ব্রীজ রাস্তা নির্মাণ বা দিঘী খনন করা হয়েছে তা অন্য সব রাজাদের সব কাজ একত্র করলে তুলনীয় হয়। জয়বর্মনের পরে আস্তে আস্তে খেমার রাজাদের গৌরবের সূর্য অস্তচলে নিষ্প্রভ হয়ে পড়তে থাকে এবং থাই রাজাদের দাপট বাড়তে থাকায় খেমার রাজারা পিছু হটতে শুরু করে। রাজধানী আংকর ত্যাগ করে নম পেনে গিয়ে স্থিত হবার চেষ্টা চালায়। আংকর খেমারদের রাজধানিী ছিল ১৪৩২ খৃষ্টাব্দে পর্যন্ত এর পরে আংকরের রাজনৈতিক গুরুত্ব কমে যায়, মন্দিরগুলি অবহেলায় জংগলে ঢাকা পড়ে এবং প্রধান কয়েকটি মন্দির ছাড়া বেশির ভাগ বিস্মৃতির অন্তরালে হারিয়ে যেতে থাকে যতদিন পর্যন্ত ফরাসীরা সার্ভে করতে গিয়ে পুনরূদ্ধার না করে।

প্রাচীন আংকর নগরীর অনেকগুলি স্থাপনাই নানা বিচারে বিশ্ব পরিচিতি  পাবার যোগ্য। সেজন্য লেখাটিকে দুই ভাগে ভাগ করা হল, প্রথম ভাগে আংকরভাট মন্দিরের এবং দ্বিতীয় ভাগে অন্যান্য স্থাপনাগুলির পরিচিতি তুলে ধরার ইচ্ছা রইল। আংকর নগরীর প্রত্যেকটি স্থাপনা নিয়েই এখনও প্রচুর গবেষণা চলছে, এত স্বল্প পরিসরে বিশদ বর্নণা দেয়া সম্ভব নয় এবং তার প্রয়োজনও দেখিনা, তাই পরিচিতিমুলক বর্ণনাতেই সীমাবদ্ধ রাখা হলো।

তথ্যকণিকা

  • নিকটবর্তী সিয়াম রিপ শহরে থেকে ৬ কিলোমিটার উত্তরে এবং আংকর থম এর ১ কিলোমিটার দক্ষিণে আংকর ভাটের অবস্থান। পশ্চিম দিক থেকে এর প্রবেশ পথ।
  • নির্মাণকাল: ১১৩০ খৃষ্টাব্দে।
  • নির্মাতা: রাজা সূর্যবর্মন ( রাজত্ব কাল ১১১৩ থেকে ১১৫০)।
  • স্থপতিঃ দিবাকর পন্ডিত ( যতদূর জানা যায়)।
  • ধর্মঃ হিন্দু বিষ্ণু মন্দির।
  • উচ্চতাঃ ৬৫ মিটার ( ২১৩ ফুট)।
  • আয়তনঃ ৫০০ একর জমির উপর বিস্তৃত

আংকর ভাট ( Angkor Wat )

প্রাচীন আংকর নগরীতে ঢুকতে গেলে প্রথমেই একটি  অর্থনৈতিক বাধার সম্মুখীন হতে হয়। এলাকাটি সংস্কার এবং সংরক্ষণের দায়িত্বে রয়েছে ইউনিসেফ, তাই যেমন কঠোর নিয়ম কানুন তেমনই প্রবেশ মূল্যও অত্যধীক, দশনার্থীর ছবি সহ একটা গেট পাশ দেয়া হবে, ওটা সব সময় সাথে থাকতে হবে, যে কোন সময়ে পরিদর্শকরা দেখতে চাইতে পারে, জনপ্রতি টিকেটের হার ২০ মার্কিন ডলার। এলাকাটি অনেক বড় তাই গাড়িসহ প্রবেশে বাধা নেই। ভিতরে ঢোকার পর কিছুটা এগুলোই চোখের সামনে উদ্ভাসিত হবে পৃথিবীর অন্যতম স্থাপত্য আংকর ভাট মন্দির। চারিপাশে পরিখা, তবে প্রতিরক্ষার জন্য যে তা খনন করা হয়নি তা মন্দিরের প্রাচীর দেখলেই বোঝা যায়।

হিন্দু মহাজাগতিক দর্শনে বিষ্ণু দেবতা পশ্চিমের অধীশ্বর,  তাই এই বিষ্ণু মন্দিরের প্রবেশ পথ পশ্চিম দিক থেকে। পশ্চিম থেকে পূর্ব প্রান্ত অক্ষ বরাবর ১৫০০ মি. এবং উত্তর থেকে দক্ষিণ অক্ষ ১৩০০ মি. মাপের এত বিশাল বিস্তৃত হিন্দু মন্দির আর একটিও আছে কি না সন্দেহ। আংকর ভাট মন্দিরটি তিনটি ধাপে ক্রমশ মাঝখানে উচু হয়ে উঠেছে, বিমান থেকে তোলা ছবি দেখলে বোঝা যাবে। মন্দিরের চারিপাশ ঘিরে ২০০ মিটার চওড়া পরিখা। আংকর নগরীতে অনেকগুলি জলাশয় এবং এগুলি খননের উদ্দেশ্য নিয়েও নানা গবেষণা চলছে। পরিখা থেকে ৪০ মিটার ভিতরে ৪.৫ মিটার উচু দেয়াল, চারপাশের  এই দেয়ালে দক্ষিণ, পূর্ব এবং উত্তর দিকে একটা করে প্রবেশ মুখ থাকলেও পশ্চিমে আছে ৫টি। পশ্চিম দিকে জলাশয়ের উপর দিয়ে একটা চওড়া ব্রীজ সরাসরি প্রধান প্রবেশ দ্বারে পৌছে দেয়। ব্রীজের দু পাশে রেলিং সুর অসুরের যৌথ উদ্যোগ সমুদ্র মন্থনের কাহিনী দিয়ে তৈরি। রেলিং এর আনুভুমিক দীর্ঘ পাথরটি আসলে মহানাগের ভাষ্কর্য, নাগ খেমার রাজবংশের প্রতীক। আংকর নগরীর অন্যান্য ভবনেও সমুদ্র মন্থন এবং নাগের সদর্প উপস্থিত। ব্রীজটা যথেষ্ট চওড়া, দু পাশের নাগ বা সাপ রেলিং বেশ চওড়া, ব্রীজের মাঝখানে একটা বিরতি, সেখান থেকে ধাপ দু পাশের পানিতে নেমে গেছে, রেলিং এর সাপ ঘুরে এসে জলাশয়ের দিকে মুখ করে বিশাল ফণা তুলে আছে, অবশ্য এখন ফণার পাথর অনেকাংশ কালের সংঘাত ভেঙে গেছে। সাপের ফনার সামনে সিংহমূতি, মাথা তুলে সতর্ক অবস্থায় দাঁড়িয়ে আছে। পশ্চিমের প্রবেশ মুখে কয়েকটি ধাপে উঠতে হয়, এই প্রবেশ মুখটির ছাদ দক্ষিণ ভারতের গোপুরার মত উঁচু এবং প্লানে যোগ চিহ্নের মত। সোজা গেলে বিশাল খোলা চত্বর পেরিয়ে মূল মন্দির আর ডানে এবং বামে করিডোর দিয়ে আরও কয়েকটি অপেক্ষাকৃত ছোট প্রবেশ মুখের সাথে সংযুক্ত। এই প্রবেশ তমুখের দু পাশে দুটি চেম্বারে সহদেবতাদের মূর্তি। পাশেল করিডোরগুলোর বাইরের দিকে কারুকার্যময় পাথরের গ্রীল, তার ফাক দিয়ে জলাশয়ের নয়নাভিরাম দৃশ্য। অন্যাপাশে বদ্ধ দেয়াল তাই করিডোর থেকে মন্দিরের ভেতরটা দেখা যায় না, তাই বলে হতাশ হবার কিছু নেই, দেয়ালের গায়ে যে রিলিফ ভাষ্কর্য আছে তা দেখতেই দশনার্থীর বেলা কেটে যেতে পারে। করিডোরের ছাদ ঢালু অনেকটা ভল্টের মত বাঁকানো, ছাদের উপর টালির সারির মত ডোকেরেশন, এও সেই সাপ অর্থ্যাৎ হাজার হাজার সাপ ছাদের উপরে পাশাপাশি শুয়ে আছে, দূর থেকে অবশ্য রেখা বলে মনে হয়। এই ধরনের ছাদ আমাদের দোচালা ছাউনির কথা মনে করিয়ে দেয়, এই ছাদের ব্যবহার সমগ্র আংকর নগরীর বিভিন্ন মন্দিরে ব্যাপক ভাবে করা হয়েছে। পাশের প্রবেশ মুখমন্ডলিতে পাশাপাশি চেম্বার আছে  সেখানেও ফুলের মালা আর পায়ের কাছে চন্দনের বাটি এবং ধুপধুনো নিয়ে পূজনীয় দেবতারা দাড়িয়ে আছেন, কাউকে কাউকে আবার গোরুয়া কাপড়ে আবৃত করা হয়েছে। আবার প্রধান প্রবেশ দ্বারে ফিরে যাই, ঢোকার মুখে দেবতা মূর্তি দৃষ্টি আড়াল করে দাড়িয়ে, মূর্তির পিছনে আরেকটি চেম্বার তারপর একটা প্যাভেলিয়ন, শেষ চেম্বার পার হতে গেটে দাঁড়ালেই হঠ্যাৎ চোখের সামনে বিশাল আংকর ভাট মন্দির উদ্ভাসিত হয়ে পড়ে। এই নাটকীয়তায়  যে কোন আগুন্তক অভিভুত হয়ে পড়বেন তাতে কোন সন্দেহ নাই। নীল আকাশের পটভূমিতে বহুচূড়ার এই মন্দির যে ভাবগম্ভীর মূর্তি নিয়ে প্রতভিাত তা সাধারণ মানুষের মনে এক আপেক্ষিক ক্ষুদ্রতা  এনে দেয়।

প্রবেশ দ্বারের থেকে সোজা মন্দির গেটে পৌছানোর জন্য শান বাধানো পথ, দু পাশে বিশাল সবুজ চত্বর। এই পথের দু পাশে দুটি লাইব্রেরী ছিল, ভগ্নদশা, এখন সংস্কার চলছে আরও ছিল দুটি ছোট পুকুর, মন্দিরে প্রবেশের আগে পবিত্র হয়ে নেবার জন্য হয়ত, এখন প্রায় ভরাট হয়ে এসেছে, পানি নেই, তারপর কয়েক ধাপে উচু একটা প্লাটফর্ম। এই পথের দু পাশেও সেই নাগ রেলিং এবং বিরতি। প্লাটফর্মের ব্যবহারিক  উদ্দেশ্য কি ছিল তা বোধগম্য না হলেও মূল মন্দিরে প্রবেশের পূর্বে একটা মানসিক প্রস্তুতি তৈরি হয়। হয়ত এখানে পুরোহিতরা জনসাধারণের উপস্থিতিতে কোন আচার অনুষ্ঠান করতেন।

মন্দির তিনটি ক্রমশ উচু এবং ছোট হয়ে আসা পর্যায়ে পরিকল্পিত। প্রতিটি পর্যায় বা স্তরের সীমানা কোন গ্যালারী বা প্রদক্ষিণ পথ দিয়ে আলাদা করা হয়েছে পান দেখলেই বোঝা যাবে। এর প্রথম পর্যায়েও একই রকম চেম্বার সহযোগে  প্রবেশ দ্বার। এবার কিন্তু প্রবেশ মুখের সাথে সংযোজিত হয়েছে একটা প্রদক্ষিণ পথ। সমগ্র মন্দিরটি ঘুরে আসা যায়, প্রদক্ষিণ পথের বাইরের দিকটা সারিবদ্ধ পিলার আর ভিতর দিক রিলিফ ভাষ্কর্য খচিত বদ্ধ দেয়াল।

রামায়ন, মহাভারত, খেমার রাজের যুদ্ধ জয়ের ইতিবৃত্ত এই রিলিফের প্রতিপাদ্য বিষয়। ভাষ্কর্যের ক্ষেত্রে ভারতে অনুসৃত তাল বা মাপ এখানে তঅনুপস্থিত হলেও চিত্রায়নে প্রভাব স্পষ্ট। একা কাহিনী থেকে অন্য কাহিনীতে প্রবেশ বা একস্তরের সাথে অন্য স্তরকে মেলানোর জন্য কম্পোজিশনের যে সব চাতুর্য ব্যবহৃত হয়েছে তা শিক্ষণীয়। ভারতের মন্দিরের ( কাজুরাহো, কোনার্কের সূর্য মন্দির) হাই রিলিফের বদলে সাধারণ গভীরতার রিলিফ হলেও বক্তব্য প্রকাশে এতটুকু কষ্ট হয়নি। ভারতীয় ভাষ্কর্যের মূলমন্ত্রে দীক্ষিত হয়েও দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ার ভাষ্কর্য এ সময়ে যে নতুন  মাত্রা অর্জন করেছিল তার প্রমাণ এই কাজগুলো। খুটিয়ে খুটিয়ে দেখতে গেলে এই প্রদক্ষিণ পথের মধ্যেই কয়েক বার বিশ্রাম প্রয়োজন হয়ে পড়ে। তিনটি পর্যায় বা স্তরের এই নীচের স্তরের প্রদক্ষিণ পথের চারটি কোণা এবং প্রত্যোক পাশের মাঝামাঝি একটা করে যে বিরতি তৈরি করা হয়েছে তার ছাদগুলি উচু ভল্টের মত যা প্রদক্ষিণ পথের কলাম সারিকে একটা ফ্রেমের আওতায় এনেছে। এই বিরতিগুলো সীমানা থেকে ধাপে ধাপে  একটু বেরিয়ে  এসে মন্দিরের দৃঢ় ভিত্তির আভাস দিচ্ছে। স্থাপতিক দৃষ্টিকোণ থেকে এর ভল্ট ছাদ এবং বেরিয়ে আসা কলাম সমৃদ্ধ প্যাভিলিয়রেন মত কম্পোজিশন খুবই প্রাসঙ্গিক। প্লান দেখলে বোঝা যায়, মন্দির বর্গাকৃুত নয় বরং উত্তর ও দক্ষিণ পাশ অপেক্ষাকৃত দীর্ঘ।

নীচের স্তরের পশ্চিমের সিংহদ্বারে আবার ফিরে আসি, প্রদক্ষিণ পথে না গিয়ে যদি সোজা ভিতরে ঢুকতে চাই, তাহলে সোজা একটা সিড়ি উপরে পরে স্তরে উঠে গেছে। ডান পাশে বুদ্ধ মূর্তির গ্যালারি ( হিন্দু, বৌদ্ধ মিলনের নির্দশণ) বা পাশে ফাকা হল, এখানে দেয়ালে কান পাতলে দূরের সুক্ষাতিসূক্ষ্ম শব্দ শোনা যায়, লক্ষ্মৗ নগরীর নবাবদের তৈরি ভুলভুলাইয়া বা গোলক ধাঁধার মত প্রাসাদেও দেয়ালের মধ্যে শব্দ সঞ্চালন পদ্ধতি প্রতিরক্ষার উদ্দেশ্যে ব্যবহৃত হয়েছে যা মানুষের বিষ্ময়ের উদ্রেক করে। এই পশ্চিম প্রান্তে দুই স্তরের মাঝখানের ফাকা জায়গায় দুই কোণে দুটি লাইব্রেরি কক্ষ আছে। মাঝখানের সিড়ি দিয়ে ২য় স্তরে উঠে এলে, ১০০ মি. × ১১৫ মি. মাপের চারদিকের ঘেরা প্রদক্ষিণ পথ। মাঝে মাঝে পাথরের গ্রীল দিয়ে আলো প্রবেশ করে। এখানে সাধারণের প্রবেশ নিষিদ্ধ ছিল, দেয়ালের উৎকীর্ণ ১৫০০ স্বর্গীয় অষ্পসা নানা নৃত্য ভঙ্গিমায় অবতীর্ণ, এরা সমুদ্র মন্থনের ফলে উঠে এসেছে। রাজা এবং পুরোহিতদের ধ্যান সাধনার জন্য এমন স্বর্গীয় সুখের আবহ খুবই প্রয়োজন। ২য় স্তর এবং সর্বোচ্চ ৩য় স্তরের মাঝখানে ফাকা জায়গায় দাড়ালে চোখে পড়বে পাহাড় প্রতীম ৩য় স্তরের চূড়াগুলো। যেখানে রাজা এবং পুরোহিতেরেই শুধু প্রবেশাধীকার সংরক্ষিত, যদিও বর্তমানে সকলের জন্য উন্মুক্ত। খাড়া পাথুরে সিড়ি বেয়ে উপরে ওঠা সহজ নয়।

৫০ মি. × ৫০ মি. উচু বর্গাকৃতি দাড়িয়ে আছে আংকর ভাট মন্দিরের ( Angkor Wat Temple )এই মূল কেন্দ্র। এখানে কোন গ্যালারি নেই, চার কোণে চারটি চূড়া এবং মাঝখানে সবচেয়ে উচু চূড়া। চারিপাশে করিডোর থেকে  বাইরের নয়নাভিরাম ক্রমাবনতীর দৃশ্য। এখানে উঠলে নীচের মানুষকে ছোট এবং নিজেকে দেবতাতুল্য বলে মনে হওয়াই স্বাভাবিক। মাঝখানের চূড়া ২য় স্তর থেকে ৪০ মি. উঁচু। ক্রশের উচ্চতম এবং বর্গাকৃতির এই ৩য় স্তর আবার যোগ চিহ্নের ত করিডোর দিয়ে চারিট বর্গক্ষেত্রে  বিভক্ত। বর্গক্ষেত্রের মাঝখানের উন্মুক্ত আকাশ। যোগ চিহ্নের কেন্দ্রের উপরে নির্মিত হয়েছে উচ্চতম চূড়া, নীচে মূল গর্ভগৃহ, বিষ্ণু মূর্তির অবস্থান। যতই উপরের দিকে উঠছে, ততই বাহ্যিক অলংকরণ কমছে, কিন্তু স্থাপতিক অনুষঙ্গ তার ধারাবাহিকতা বজায় রেখেছে। আংকর ভাট মন্দিরের মূল উপাদান বেলে পাথর তবে ভিত্তিমূলে পোড়া ইট ব্যবহৃত থাকতে পারে, এই পাথর ৩০ কি. মি. দূরে নম কুলেন পাহাড় থেকে সংগৃহীত, কাঠ  এবং তামা ব্যবহার হয়েছে, কাঠের অংশগুলি বর্তমানে বদলানো হয়েছে, কিছু কিছু জায়গায় আছে। স্টাকে প্লাষ্টারও কোন কোন জায়গায় করা হয়েছে। নির্মাণ উপাদানের উপযোগীতা, সহজ প্রাপ্যতার উপর নির্ভর করেই সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে, উপাদানকে প্রর্দশণীর আয়োজন নেই।

আংকর ভাট ( Angkor Wat ) পরিকল্পনায় আংকর হিসাব

গবেষকরা বলেছেন আংকর ভাট মন্দির গ্রহ নক্ষত্রের অবস্থানের গাণিতিক হিসাবের ভিত্তিতে পরিকল্পিত হয়েছে। কোন একটা মাপের গুণিতকে সবকিছু  নির্ধারিত হয়েছে, তখনকার দিনে হাতের দৈর্ঘ্য ব্যবহৃত হত, তাহলে কোন নির্দিষ্ট হাতের দৈর্ঘ্য হতে হবে, অনেক গবেষণার পর দেখা গেছে সেই মাপের এককটি . ৪৩৫৪৫ মিটারের সমান যা রাজা দ্বিতীয় সূর্যবর্মনের হাতের দৈর্ঘ্য। এক হাতকে বলা হয় Cubit, এমনই চারহাত সমান দৈর্ঘ্যক খেমার ভাষায় ফিয়াম, এই অক্ষ দুটি পশ্চিম থেকে পূর্ব এবং দক্ষিণ থেকে উত্তরে প্রলম্বিত।

হিন্দু মহাজাগতিক দর্শনের হিসাবে কাল ( সময়) চারটি যুগে বিভক্ত। যেমন- কৃত ( সত্যযুগ), ক্রেতা, দ্বাপর এবং কলি। আমার কলি ‍যুগের মানুষ। এই যুগ শেষ হবার উপায় নেই, তা আবার চক্রাকারে ফেরত আসে। বছরের হিসাব দুই রকম, পৃথিবীর বছর আর স্বর্গীয় বছর। চার যুগের একবার আবর্তনে একটা মহাযুগ। ১৪টি মহা ‍যুগ এবং ১৫ টি কৃত যুগের যোগফল হলো এক কল্প যুগ ( ৪,৩২,০০০,০০০ পৃথিবীর বছর)। ৭২০ কল্পে ব্রম্মার এক বছর, এমনি ১০০ বছর যখন ব্রম্মার বয়স হবে তখন সবকিছু শেষ হয়ে গিয়ে ঘুমন্ত ব্রম্মার সাথে মিলিত হয়ে বিলীন হয়ে যাবে।

এই চার যুগকে গাণিতিক হিসাবে প্রতিফলিত করা হয়েছে পশ্চিম থেকে পূর্বের অক্ষে প্রতি ১০০০ পৃথিবী বর্ষকে ১ হাত বা .৪৩৫৪৫ মি. হিসাবে। লক্ষণীয় অপব্রিত কলি যুগের মানুষ পশ্চিম দিক থেকে ঢুকছে, তাই কলি যুগকে ব্রীজের মধ্যেই অর্থ্যাৎ বর্হিদেয়ালের বাইরেই রাখা হয়েছে। তেমনি উত্তর দক্ষিণেল অক্ষকেও ভাগ করা হয়েছে, তবে অন্য হিসাবে যেহেতু মানুষ ঐ দিক দি  প্রবেশ করবে না। মন্দিরের ক্রম স্তরগুলিতে এই কালের হিসাবের সাথে সামঞ্জস্য রেখেই স্থাপতিক উপাদান যেমন- প্রদক্ষিণ পথ, বিরতি, রিলিফ ভাষ্কর্যের মাপ এবং বিষয়বস্তু নির্ধারিত। সমগ্র মন্দির পরিকল্পনায় এমন কিছুই নেই যা ঐ মডিউলের হিসাবের  বাইরে। কোন উপাদানের মাপ কেন ঐ মাপের হয়েছে তার গাণিতিক যুক্তিও রয়েছে। স্থাপত্যে অংকের এবং দর্শনের এমন সমন্বয় পৃথিবীর আর কোন ইমারত হয়েছে কিনা জানা নেই।

পশ্চিম গ্যালারি

১) কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধ (মহাভারত)

১১) লংকার যুদ্ধ ( রামায়ন)

দক্ষিণ পশ্চিম কোণেল গ্যালারি

২) রামায়ন কাহিনী

দক্ষিণ গ্যালারী

৩) রাজা ২য় সুর্যবকর্মনের যুদ্ধ জয়ের উপাখ্যান

৪) যমের বিচার এবং স্বর্গ ও নরকের দৃশ্য

পূর্ব গ্যালারি

৫) সমুদ্র মন্থন

৬) বাণী এবং উপদেশ

৭) বিষ্ণুর দুষ্ট দমন কাহিনী

উত্তর গ্যালারী

৮) কৃষ্ণের যুদ্ধ জয়

৯) দেবতা এবং অসুরদের যুদ্ধ

উত্তর পশ্চিম কোণের গ্যালারি

১০) রামায়ন কাহিনী

আংকর ভাটের ভাষ্কর্য  – Angkor Wat Sculpture

ভারতের হিন্দু মন্দিরগুলির মত বেলে পাথর কেটে খোদাই করা ভাষ্কর্যের প্রাচুর্যে আংকর ভাটকে বিশাল আর্ট গ্যালারী বললে অত্যুক্তি হয় না।  এই খোদাই কাজকে মোটামুটি দুই ভাগে ভাগ করা যায়, এক, বিল্ডিং অলংকরণ দুই, রিলিফ এবং দেবমূর্তি। অলংকরণের প্রাচুর্য থাকলেও তা স্থাপত্য উপাদানের সহযোগী হিসাবেই এসেছে, কখনোই স্থাপত্যকে অতিক্রম করেনি। এখানে বার বার নাগ, রিং, ফুল, লতা পাতা, নৃত্যরতা অস্পরী ব্যবহৃত হয়েছে। করিডোরের ঢালু বাকানো ছাদ, কার্নিস, কলাম, করিডোরের গ্রীল, জানালা দরজার ফ্রেম সর্বত্রই অলংকরণ। এসব খোদাই কাজে জ্যামিতিক সীমা রেখার মধ্যে থেকেই ইচ্ছামত প্রাকৃতিক বিষয়াদী গ্রহণ করা হয়েছে, তবে কোন কিছুই অপ্রাসঙ্গীক মনে হয় না। পৌরাণিক কাহিনী বর্ণনার জন্য করিডোরের দেয়াল রিলিফ ভাষ্কর্যে উৎকীর্ণ করা হয়েছে। বিষয়বস্তুর কাহিনী, মন্দির স্থাপত্যে ব্যবহৃত কালানুক্রমিক স্তরে বিভিন্ন, যেমন প্রথম স্তরে দেবরাজা সূর্যবর্মনের নানা যুদ্ধ জয়ের চিত্র আবার দ্বিতীয় স্তরে, স্বর্গীয় অষ্পসরাদের নৃত্যকলা। বিষ্ণু দেবতার নানা অবতার কাহিনীও প্রথম স্তরে কারণ তা মর্তের সাথে সংশ্লিষ্ট। এসব রিলিফ প্যানেলের মাপ, রিলিফে প্রকাশিত সুর বা অসুরের সংখ্যা স্থাপত্যে গাণিতিক হিসাবের সাথে সম্পৃক্ত।

সামগ্রিক স্থাপত্য বিচার

আংকর ভাটের রিলিফ ভাষ্কর্য এতই আর্কষনীয় যে, ভাষ্কর্য না স্থাপত্য কোনটি বেশি গুরুত্বপূর্ণ তা নিয়ে সংশয় জাগে। তবে সম্পূর্ণ মন্দিরটি ঘুরে দেখলে এর স্থাপত্য শৈলি যে অন্যান্যে  যে কোন বিষয়কে ছাড়িয়ে অনেক উপরে অবস্থান করছে সে সম্বন্ধে আর সন্দেহ থাকে না।

গাণিতিক হিসাবের কথা না ধরলেও,  এর প্রতিটি ত্রিমাত্রিকক পারসরের মান এতই যথার্থ  সে সকল মাত্রায়ই তা বিশ্বমানের স্বীকৃতি পাবে। স্পেসের গতিময়তা, নাটকীয়তা, আলো ছায়া সবই সুনিশ্চিত। পর্যায় ক্রমিক স্তরের মাঝখানে ক্রমশ ছোট হয়ে আসা উন্মুক্ত উঠোনগুলি তার চারপাশের বিল্ডিং এর সাথে সংগতি রেখেই তৈরি হয়েছে। মন্দিরের চূড়াগুলি শিখর কাল্পনিক ভাবে যোগ করলে পিরামিডের মত হয়ে যায়। অর্থ্যাৎ মাঝখানের শিখর থেকে অন্যান্য শিখরগুলি ক্রমশ নির্দিষ্ট মাপে নেমে   এসেছে যা থিওডোলাইট দিয়ে দেখলে প্রায় একটা লাইনের সূত্রপাত ঘটায়, এখানেও গ্রহ নক্ষত্রের হিসাব আছে, প্রতিটি চূড়া, প্রতিটি গেট অক্ষ রেখার সাথে মিলিয়ে মহাকাশেল নির্দিষ্ট নক্ষত্রের প্রতীক। হিন্দু শাস্ত্র মতে মহাজগতের কেন্দ্র হল ‘মেরু’ পর্বত, আংকর ভাট মন্দিরের কেন্দ্রীয় শীর্ষ চূড়া মেরু পর্বতের প্রতীক এবং অন্যান্য ৪ টি চূড়া ঐ  পর্বতামালারই নানা শৃঙ্গ, বাইরের সীমানা এবং চারিদিকের জলধার মহাসাগরের প্রতীক। গ্রহ নক্ষত্রের অবস্থান পরিবর্তনের হিসাবের সাথে সামঞ্জস্য রেখে মন্দিরের বিভিন্ন অংশের দুরুত্ব   এবং অক্ষ নিরূপিত হয়েছে। পূর্ব পশ্চিমের অক্ষে বছরের একটা নির্দিষ্ট দিনে সূর্য অবস্থান করে, নিচের ছবিটি তার প্রমাণ।

ছবিটি আংকর ভাটের উত্তর দিকের প্রথম সিড়িটির শীর্ষ থেকে তোলা হয়েছিল। সময়টি ছিল ২১ শে মার্চ, ১৯৯২। তৎকালীন জোতির্বিদদের মতে বছরের এই সময়টিতে সূর্যকে আংকর ভাটের ( Angkor Wat ) প্রধান অক্ষরেখা বরাবর মাঝখানের সবচেয়ে বড় চূড়ার ঠিক শীর্ষে দেখা যায়।

  • আগামীতে আংকর নগরীর অন্যান্য প্রধান ইমারতের বর্ণণা ছাপা হবে।
  • ব্যবহৃত ছবি এবং ড্রইং বিভিন্ন বই এবং লেখকের নিজের তোলা  ছবি থেকে গ্রহণ করা হয়েছে।

ভারতবর্ষ থেকে আগত হিন্দু ধর্মের মন্দিরে ভারতীয় স্থাপত্য ও ভাষ্কর্যের প্রভাব থাকাটাই সমীচীন। কিন্তু খেমার স্থাপত্যকলা সেই প্রভাব বলয় ছাড়িয়ে নিজস্ব ধারা সৃষ্টি করেছিল এবং বহুদূর এগিয়ে স্বমহিমায় প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল তার জ্বাজ্জল্য প্রমাণ আংকর ভাট এবং আংকারের অন্যান্য স্থাপনাগুলি। খেমার রাজত্বের অবসানের পরে বহুযুগ বনজংগলে আবৃত হয়ে থাকায় বেশিরভাগ ভবনের অনেকাংশ কালের সংঘাতে বিলীণ হয়ে যাচ্ছিল। আধুনিক সচেতন বিশ্বের সহায়তায়, নবতর প্রযুক্তিতে এসব ভবন সংরক্ষণ চলছে। আংকর ভাট নিয়ে নিত্য নতুন গবেষণা চলছে,  এসব গবেষণার পুরোধা পশ্চিমা গবেষকরা। সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের যোগসূত্র, ঐতিহাসিক পটভুমি এবং খেমারদের প্রযুক্তির শিক্ষার ভিত্তি খোঁজার  তাগীদ তাদের নেই, একাজ এশিয়ার  মানুষকেই করতে হবে। যত দ্রুত তারা একাজে নামবেন ততই মঙ্গল।


Ask For Rent/ Fare

Calendar is loading...
Powered by Booking Calendar

We will let you know the "Rent/Fare" within 10 minutes through SMS or Email.
Call Now ButtonCall Now!
Skip to toolbar