শুটকিতে কীটনাশকঃ অসুস্থ হচ্ছে মানুষ

শুটকিতে কীটনাশকঃ অসুস্থ হচ্ছে মানুষ

শুটকিতে কীটনাশকঃ অসুস্থ হচ্ছে মানুষ

রফিকুল ইসলাম

শুটকিতে  মাছের সাথে বিষ খাচ্ছে দেশের কোটি মানুষ। ক্ষতিকর প্রভাব পড়ছে পরিবেশের উপর মানুষ আক্রান্ত হচ্ছে নানা রোগে। দেশের গোটা উপকুলীয় অঞ্চল জুড়ে বিষ মিশিয়ে প্রক্রিয়াজাত করা হচ্ছে নানা জাতে শুটকি মাছ। দেশের উপকুলীয় অঞ্চলে শুটকি শুটকি প্রক্রিয়াজাতকরণের ধারাবাহিকতা দীর্ঘদিন ধরে চলে আসলেও এতে বিভিন্ন ধরনের কীটনাশক ব্যবহারের ঘটনা অতি সাম্প্রতিক। ইতিপূর্বে শুটকি মাছ প্রক্রিয়াজাতকরণের বিষয়টি ছিলো প্রকৃতিনির্ভর। কিন্তু এখন তা নেই। শুটকি ব্যবসায়ীরা অধিক লাভ ও মুনাফার লোভে নান জাতের কীটনাশক নগস, বরিক পাউডার ইত্যাদি ব্যবহার করছে। এক তথ্যে জানা গেছে, শুটকি রপ্তানি, পন্য হিসেবে গন্য হবার পর থেকেই এ ক্ষতিকর কীটনাশকের ব্যবহার শুরু হয়। এবং এটা সম্ভবতঃ ১৯৮৩- ৮৪ সাল থেকে। শুটকি প্রক্রিয়াজাতকরণের সাথে সয়শ্লিষ্টরা অবশ্য বলেছেন, দীর্ঘকালীন সময়ের মধ্যে যাতে মাছগুরো কীটদ্বারা আক্রান্ত না হয়, সে কারণে কীটনাশক ব্যবহার করা হয়।

শুটকি প্রক্রিয়াজাতকরণ কারখানা পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে, ঐ কারখানাগুলোতে মাছ শুকানোর জন্য ক্ষতিকর ডিভিটি, নগস বরিক পাউডার ইত্যাদি ব্যবহার করা হয়। তবে যে সব কারখানা থেকে সরাসরি শুটকি রপ্তানি করা হয়, সেগুলোতে কীটনাশক সরবারহ, ব্যবহার বিধি ও ব্যবহার সরাসরি ক্রেতার তরফে হয়ে থাকে। বিশেষজ্ঞরার বলেছেন, এই কীটনাশক যে কোন প্রাণীর জন্যে মারাত্মক ক্ষতিকর। তারা বলেন, জমিতে ধান উৎপাদনের জন্য যে ডিডিটি ব্যবহার করা হয়ে থাকে, ঐ ধানের চাল কোন প্রানীর পেটে গেলে দীর্ঘ সময় নিয়ে তার একটি বিরূপ প্রতিক্রিয়া শুটকি মাছের বিষক্রিয়া প্রাণীকে ক্ষতি করে।

সাম্প্রতিককালে দেশের সর্বত্র শুটকি প্রক্রিয়াজাতকরণ পুরোপুরি কীটনাশকের উপরই নির্ভরশীল। সওদাগররা কীটনাশক ব্যবহারের পর এর ফলাফল অর্থ্যাৎ মুনাফা বেশি পাওয়াতে কোন ঝুকি নেন না। ফলে কীটনাশক ব্যবহারের মাত্রা বেশ ব্যাপক। বর্তমান সময়ে, বলতে গেলে মাছ, পানি, থেকে তোলার পরেই কীটনাশক ব্যবহার শুরু হয়ে যায় শুটকি হয়ে চালান হওয়ার সময়ও পাউডার ব্যবহার করা হয়। গুদামে রাখার সময় আবার ছিটানো হয় পাউডার।

বর্তমানে দেশের বিভিন্ন স্থানে প্রক্রিয়াজাতকরণ কারখানা পাড়ে উঠেছে। এর মধ্যে দক্ষিণ উপকুলীয় অঞ্চলে সবচেয়ে বেশি। বরগুনা, পটুয়াখাল, বরিশাল, খুলনা, কক্সবাজার, চট্রগ্রাম, ময়মনসিংহ, সিলেট প্রভৃতি এলাকায় কারখানা গড়ে উঠেছে। বাংলাদেশের ভৌগলিক কাঠামো অনুযায়ী প্রধানত উপকুলীয় অঞ্চলগুলাই শুটকি প্রক্রিয়াজাতকরণের স্থায়ী কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত। পটুয়াখালীর কুয়াকাটায় শুটকি প্রক্রিয়াজাতকরণ এবং সংগ্রহের ক্ষেত্রে একটি পদ্ধতিগত ব্যবস্থা গড়ে উঠেছে।  এখানকার মাঝারি ধরনের কারখানাগুরো সমুদ্র থেকে মাছ সংগ্রহ থেকে শুরু করে প্রক্রিয়াজাতকরণের ভেতর দিয়ে আর্ন্তুজাতিক বাজার পর্যন্ত পৌছে দেয়। প্রতিটি কারখানায় সংগ্রহকারী নির্দিষ্ট দর মোতাবেক মাছ সরবারহ করে। তাদের সরবারহকৃত মাছ এ্ই কারখানাগুলোর চালিকাশক্তি কারখানা থেকে আর্ন্তজাতিক বাজারে আজ অবধি যেসব প্রজাতির মাছ চাহিদা সৃষ্টি করেছে সে গুলোর মধ্যে অন্যতম পোয় মাছ । এছাড়াওি ল্যাইটা, পুটি, রুপচান্দা, হাঙ্গর প্রর্ভতি কিছু কিছু ক্ষেত্রে আর্ন্তজাতিক বাজারে সামান্য চাহিদের সৃষ্টি করেছে তবে, দেশের অভ্যন্তরীণ বাজারে পুটি, রূপচান্দা ও লাইট্যা মাছের চাহিদা সবচেয়ে বেশি।

শুটকি প্রক্রিয়াজাতকরণ এলাকা পর্যবেক্ষণে দেখা যায়, বাংলা কার্তিক থেকে বৈশাখ মাছ পর্যন্ত এ কাজ চলে। কুয়াকাটার কারখানাগুলোতে মাছ সরবারহ করার লক্ষ্যে যে সব জেলে ও সংগ্রহকারীরা সাগর থেকে মংস্য শিকার করে, তাদের অধিকাংশের ক্ষেত্রেই সংগ্রহ করা পর্যন্ত দায়িত্ব শেষ। কারণ কারখানাগুলোর নিজেদের যে নৌযান রয়েছে, সেগুলোই সাগর রক্ষে এগিয়ে যায় সংগৃহীত মাছের সরবারহ নেয়ার জন্য। কোন কোন ক্ষেত্রে সংগৃহীত মাছের মুল্য আকার অনুযায়ী নির্ধারিত থাকে, আবার অনেক ক্ষেত্রে থাকে না। সংগ্রহকারীদের জন্যে কিনারে পৌছাতে দুরপাল্লায় পথ হলে কদাচিৎ বরফ ব্যবহার লক্ষ্য করা যায়। পাশাপাশি সংগ্রহকারীরা মাছের পেটের বর্জনীয় নৌকায় বসেই ফেলে দেয়।

উপকূলীয় অঞ্চলের সাগরের অথবা নদীর মোহনায়, কিংবা জেগে ওঠা, চরে শুটকি প্রক্রিয়াজাতকরণের কাজ চলে। বরগুনা জেলার পাথরঘাটা, তালতলী, আশার চর, লালদিয়া, নলী, নলবুনিয়া, পটুয়াখালী জেলার গঙ্গামতি, কুয়াকাটা, রাঙাবিল, খেপাপাড়া, মহিপুর, সুন্দরবন সংলগ্ন দুবলার চরে মৌসুমে প্রক্রিয়াজাতকরণ কাজ চলে এসব স্থানে মধ্য অক্টোবর থেকে মধ্য এপ্রিল  পর্যন্ত বিপুল সমারোহ প্রক্রিয়াজাতকরণ এর কাজ চলে। মৌসুমে এসব অঞ্চলে বাইরে থেকে নিসম্বল পরিবারগুলো এসে কাজে যোগ দেয়। নারী পুরুষ শিশু সম্বন্বয়ে এই পরিবারগুলো এসে এখানে অস্থায়ী বসতি গড়ে। এরা ভাগ হয়ে পড়ে ব্যবসায়ী, মৎস্য শিকারী এবং প্রক্রিয়াজাতকরণ শ্রমিকে। মৌসুমে শেষে সবাই আবার ফিরে যায় নিজ নিজ স্থানে।

সাগর থেকে জেলেরা নির্দিষ্ট মৌসুমে মাছ শিকার করে ব্যবসায়ীদের নিকট তা নির্দিষ্ট করে বিক্রি করে দেয় এবং ব্যবসায়ীরা তা পর্যায়ক্রমে শুটকি প্রক্রিয়াজাত করে থাকে। সাগর মোহনায় একটি স্থান “আশার চর” পর্যবেক্ষণ করে দেখা গেলা, সেখানে মৌসুমে হাজার হাজার লোকের সমাগম ঘটে। নারী পুরুষ শুধু নয়, শিশুরাও সেখানে শুটকি প্রক্রিয়াজাতকরণের সাথে জড়িত। ইতিমধ্যে ‘আশারচর’ শুটকি প্রক্রিয়াজাতকরণের জন্য বিখ্যাত হয়ে উঠেছে। ফাতারারবন পরিবেষ্টিত এ অঞ্চলে বাংলা কার্তিক মাছ থেকে চৈত্র্যে বৈশাখ মাস পর্যন্ত শুটকি মাছ এর প্রক্রিয়াজাতকরণের জন্য বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠে। শুটকি প্রক্রিয়াজাতকরণের আরেকটি স্থান হলো ‘দুবলারচর’। এটি সুন্দরবন সংলগ্ন। এখানে মৎস্য সংগ্রহ ও সাগরবক্ষে পরিবহনে যে ট্রলারগুলো নিয়োজিত সে গুলোর অধিকাংশই ৯শ থেকে এক হাজার কেজি ধারণক্ষমতাসম্পন্ন। গোটা দুবলারচর এলাকায় মৎস্য ব্যবসার সরকারী খাজনা আদায় করে বাংলাদেশ বন বিভাগ। বনবিভাগ এক মৌসুমে নৌকা প্রতি দশ টাকা করে টোল আদায় করে । এটা কেবলমাত্র আহরণ ক্ষেত্রে উপস্থিতি চাদা। এটা কেবলমাত্র আহরণ ক্ষেত্রে উপস্থিতি চাদা। এরপর মৎস্য শিকার কর উপকুলে আসার পর প্রতিমণ মাছের জন্য ৬৫ টাকা বনবিভাগকে দিতে হয়। বনবিভাগ অবশ্য এ টাকা গ্রহণের রশিদ প্রদান করে।

বাংলাদেশ সরকারের মৎস্য উন্নয়ন কর্পোরেশন কক্সবাজারের বাজার ঘাটায় একটি শুটকি প্রক্রিয়াজাতকরণ করাখানা প্রতিষ্ঠা করেছে। বার্ষিক এক হাজার টন পোল্ট্রি খাদ্য উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নিয়ে বর্তমানে এ কারখানাটি পরিচালিত হচেছ। জানা গেছে তাৎক্ষনিকভাবে অভ্যন্তরীন বাজারে যে প্রজাতির মাছের চাহিদা নেই, সেগুলো সংগ্রহকারীদের কাছ থেকে কিনে প্রক্রিয়াজাত করাই এই থেকে কিনে প্রক্রিয়াজাত অন্যতম লক্ষ্য। নির্দিষ্ট কোন প্রজাতির উপর নেই বলে প্রায় ৫শ ব্যবসায়ী ও সংগ্রহকারী বিভিন্ন প্রজাতির মাছ এ কারখানায় সরবারহ করে থাকে। প্রতি কেজির ক্রয় মুল্য থাকে ৭ থেকে ১৫ টাকা এই প্রতিষ্ঠানের তৈরিকৃত পোলট্রি খাবারের ক্রেতা হলো সরকার পরিচালনাধীন সকল পোলট্রী খামার এবং অধিকাংশ বেসরাকারী খামারগুলো।

শুটকি প্রক্রিয়াজাতকরণের পদ্ধতি পর্যবেক্ষণ করার জন্য বেশ কয়েকটি এলাকা পরিদর্শন করলে বাস্তব কিছু চিত্র ধরা পড়ে। স্থানগুলোর মধ্যে একটি হলো বরগুনা জেলার বঙ্গোপসাগরের মোহনায় ‘আশারচর’। আশারচরে প্রতিবছর মৌসুমে হাজার হাজার নারী পুরুষ শিশু আসে এ কাজের জন্য। এখানে কথা হয় নারী শ্রমিক আমেনা খাতুনের সাথে।

আমেনা বললেন, জীবন বাচানোর তাগিদে এখানে এসেছি। স্বামী নেই। দু মেয়ে নিয়ে সংসার। কোন মতে সংসার চলছে। সুর্য তখনও মাথার উপরে আসেনি। রোদের তাপ বাড়ছে। সেই সাথে বাড়ছে আশার চরের মানুষের ব্যস্ততা মানুষগুলো জীবন সংগ্রামে এখানে এসেছে। কেউ মাছ ধরে, কেউ শুকায়। আবার কেউবা মাছ বাছাই করে। হাজারো মানুষের মাঝেই কথা হয় আমেনার সাথে।

আমেনা জীবন বাচানোর শেষ চেষ্ঠায় এসেছেন এখানে। তার বাবার বাড়ি পিরোজপুর জেলার মঠবাড়িয়া থানার চরখানল গ্রামে। বাবা শাহাদাত আলী হাওলাদার আমেনাকে তুলে দে পার্শ্ববর্তী গ্রামের তোরাব আলীর হাতে। তোরাব আলী এর আগে চারটি বিয়ে করেছিলেন। কিন্তু আমেনাকে বিয়ে করার সময় সে তথ্য গোপন থাকে। বিয়ের পরপরই তারা চলে যায় চট্রগ্রামের পাহাড় এলাকায়। নিজেদের জমি জমা যা ছিলো, তা সব বিক্রি করে তারা সেখানে চলে যায়।

দীর্ঘদিন সেখানে থাকার পর আমেনা খাতুনের স্বামী তোরাব আলী বনে গাছ কাটতে গেলে শান্তিবাহীনির গুলিতে প্রাণ হারান। সেই থেকেই আমেনার জীবনে নেমে আসে অন্ধকার। তিনি নিরুপায় হয়ে চলে আসেন বরগুনা জেলার এই চরে। এখানে জীবন বাচানোর চেষ্টা করেছেন তিনি।

আমেনা বলেন, কাজ করতে পারলে ৮/১০ টাকা পাওয়া যায় প্রতিদিন। এ দিয়ে সংসার চলে না। কোন মতে পাতার চাল বেড়া দিয়ে আমেনা এইখানে আছেন তার বাচ্চাদের নিয়ে। বছরে পাঁচ মাস আশারচরে আমেনার মতো মহিলাদের কর্মসংস্থান মেলে। বাকি সাতমাস থাকতে হয় অন্য কাজে। আমেনা মৌসুম শেসে এখান থেকে চলে যান অনত্র। তার নির্ধারিত কোন  স্থান নেই। কোন মহাজনদরে বাড়ি ঝি এর কাজ জুটবে আমেনা নিজেও তা জানেনা।

কথা বলতে বলতে  আমেনা মাছ ভাঙ্গার কথা ভুলেই যান। তার চোখ ভিজে ওঠে। দৌড়ে এসে মেয়ে জাকিয়া কোলে উঠলে মায়ের। চুমু খোলো কয়েকটি। এই চুমুর সাথেই হয়তো মা মেয়ের গভীর অনুমতি লুকিয়ে আছে। বাইরে থেকে বোঝা যায়, অনেক ইচ্ছা থাকা স্বত্তেও মেয়ের জন্য আমেনা কিছু করতে পারছে না। আমেনা বলেন, বাচ্চার লেখাপড়ার চিন্তাতো করাই যাচ্চে না। আগে পেট, তারপর অন্য কিছু।

তলতলীর চরাঞ্চল। স্বপন মাঝি (৪০) সবেমাত্র বাসায় ফিরেছেন। সকাল থেকে বাইরে কাজ দেখাশুনায় ব্যস্ত ছিলেন। মাঝি মাল্লাসহ তারা নৌকায় নদীতে মাছ ধরতে গেছে। বিকেলে ঘাটে ফেরার কথে।

স্বপন মাঝি বললেন, মহাজনদের কাছ থেকে দাদন নিতে নিতে মোরা তো শেষ হইয়া গেছি। সিজন তো আস্তে আস্তে খারাপ হইতাছে। মোরা বাচুম কেমনে। স্বপন মাঝি প্রায় তোরো বছর ধরে এ পেশায়। তার বাড়ি বরগুনা জেলার বাইরে।  এখানে মাছ ধরতে আসে মৌসুমে।

প্রতি বছর কার্তিকের মাঝামাঝি ছয় মাসের জন্য তালতলীর চরাঞ্চলে মাছ ধরত আসেন স্বপন মাঝি। তার কর্মচারীর সংখ্যা সব মিলিয়ে ১৫ জন। এর মধ্যে আটজন নৌকায় থাকে। বাকিরা বাসায় অন্যান্য কাজ করে । মাসে কর্মচারীরা বেতন বাবদ স্বপন মাঝিকে প্রায় ১৫ হাজার টাকা গুনতে হয়।

রোদের তাপে তপ্ত হচ্ছে বাতাস। স্বপন মাঝি হাতে পাখা নিলেন। পাশেই স্ত্রী বিমলা, রনী দাড়িয়ে। বিমলা এখানে এসেছেন বিশেষ কাজে। তিনি সাধারণত বাড়িতেই থাকেন- বিমলা  বলেন, সাগরের লবণ, পানির সাথে তাদের জীবন মিশে গেছে।  একটি ছেলে আর তিনটি মেয়ে আছে তার। ওরা বাড়িতেই থাকে। কেউ পড়াশুনা করে, আবার কেউ সংসারী।

সাগরে মাছ ধরার জন্য স্বপন মাঝিকে প্রতিবছরই এই মৌসুমে মহাজনদের কাছ থেকে দাদন নিতে হয়। এবছর তিনি পুজি খাটিয়েছেন প্রায় ২ লাখ টাকা। এর মধ্যে অর্ধেকটাই দাদন নেয়া। স্বপন বলেন, দাদন নেয়ার বিনিময় মহাজনদের চাকা, চালী, টাইগার ও মটকা নামের মাছগুলো দিতে হয়। এভাবেই দাদনের টাকা শোধ হয়। টাকা শোধ হয়ে গেলে অতিরিক্ত মাছের টাকা ফেরত দেয়া হয় জেলেকে।

স্বপন মাঝি জানান, অন্যান্য জাতে মাছগুলো শুটকি করে বিক্রি করেন। তিনি বলেন  সাগর থেকে মাছ ধরে আনার পর সেগুলো বাচাই, করা হয় বাচাই শেষে মাহজনদের দেয়া হয় কিছু মাছ বাকি মাছ ভেঙ্গে শুটকি করা হয়। মাথা ভাঙ্গার জন্য মজুরী দিতে হয় কেজি প্রতি ২ টাকা। এছাড়া শুটকি মাছ শহরে পাঠাতে কেজিপ্রতি ২ টাকা ট্রলার ভাড়া দিতে হয় জেলেকে।

শুটকি প্রক্রিয়াজাতকরণের পদ্ধতি- গত সমস্য যেমন আছে তেমনি বাজারজাতকরণের প্রতিবন্ধকতা। দীর্ঘদিনেও শুটকির সুষ্ঠু বাজার ব্যবস্থা গড়ে ওঠেনি। বাজার ব্যবস্থা দেশের বিভিন্ন স্থানে পরিবেশ ও যোগাযোগ ব্যবস্থার উপর নির্ভর করে ভিন্ন ভিন্ন ধরনের। কক্সবাজারে পদ্ধতিগত যে প্রক্রিয়াজাতকরণ চলছে, তা প্রধাণতঃ আর্ন্তজাতিক বাজারকে লক্ষ্য করে। পোয়া মাছ রপ্তানির প্রতি সেখানকার ব্যবসায়ীদের ঝোক বেশি। চট্রগ্রামের কারখানাগুলো থেকে হংকং এর তিনটি প্রতিষ্ঠানের ক্রেতারা পোয়ামাছ ক্রয় করে। অভ্যান্তরীণ বাজার আছে চট্রগ্রামের আসাদগঞ্জে। সেখানকার যেসব আড়তদারী ব্যবসায়ী রয়েছেন, তারা বিভিন্ন ধরনের শুটকি মাছ কক্সবাজার থেকে সড়ক পথে এই শুটকি চট্রগ্রামের আসাদগঞ্জে পৌছানো হয়।

বরিশাল বরগুনা, পটুয়াখালী, খুলনা প্রভৃতি অঞ্চলের মাঝারি ও ছোট কারখানগুলো থেকে শুটকি মাছ চালান করা হয় কক্সবাজারে। সেখান থেকে যথারীতি চলে যায় চট্রগ্রামের আসাদগঞ্জে। এ অঞ্চল থেকে চিংড়ি ও অন্যন্য ছোট মাছের শুটকি ছাড়াও হাঙ্গর জাতীয় মাছের শুটকি দেশের বাইরেও চালান করা হয়।

দুবলারচরের বিশাল উৎপাদনেও সরাসরি আসাদগঞ্জের বাজারে পাঠানো হয়। দুবলারচর থেকে ইঞ্জিন চালিত নৌকার আসাদগঞ্জে পৌছাতে ২৪ ঘন্টার মতো সময় লাগে। তবে প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা অনুযায়ী, শুটকি পরিবহনের জন্য ব্যবহৃত নৌকাগুলো মাঝারি আকারের। ১৫০ কেজির ধারণক্ষমতা সম্পন্ন প্রতি টুকরি শুটকির সর্বোচ্চ ৬টি পর্যন্ত নৌকাগুলো বহন করতে পারে।

যে বাজার ব্যবস্থা প্র্রচলিত আছে, তাতেও দেশের চাহিদা মিটিয়ে গত পাচ বছরে শুটকি রপ্তানি করে প্রচুর পরিমাণে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করা সম্ভব হয়েছে। কিন্তু বর্তমানে শুটকিযোগ্য মৎস্য শিকারের জন্য ব্যয় বৃদ্ধি পাওয়ার অনেক জেলে তাদের বাপ দাদার পুরানো পেশা গুটিয়ে নিচ্ছে। ফলে শুটকি উৎপাদন ক্রমান্বয়ে হ্রাস পাচ্ছে।

এক পরিসংখ্যানে দেখা যায়, ১৯৮৯ সালে ২ হাজার টন শুটকি রপ্তানি হলেও জেলেদের নানাবিষ সমস্যার কারণে ১৯৯০ সালে ১৬শ টন, ১৯৯১ সালে ১৩শ টন এবং ১৯৯২ সালে তা ১২শ টনে পৌছেছে। আর্থিক সংকট, আসবাবপত্রের অভাব এবং বৈজ্ঞানিক প্রযুক্তি  জ্ঞানের অভাবে শুটকি প্রক্রিয়াজাতকরণ এ বেহাল অবস্থা পরিলক্ষিত হচ্ছে বলে স্থানীয় অধিবাসীরা বলেছেন।

তারপরও দেশে পপ্রক্রিয়াজাতকরণ কারখানার সংখ্যা বেড়েই চলেছে। মানুষের আগ্রহ বাড়ছে এর প্রতি। কর্মসংস্থান যেমন ‍সৃষ্টি হচ্ছে, তেমনি মাছের দামও অপেক্ষাকৃত বাড়ছে। উপকূলীয় অঞ্চল ছাড়াও দেশের বিভিন্ন স্থানে শুটকিযোগ্য মাছের সহজপ্রাপ্যতা রয়েছে। কিন্তু সেদিকে কারো নজর নেই।

কেবলমাত্র বরগুনা পটুয়াখালীর বিভিন্ন চরাঞ্চলসহ সমুদ্র উপকুলবর্তী এলাকা কুয়াকাটা থেকে প্রতি বছর হাজার মন শুটকি তৈরি হচ্ছে। যার মধ্যে রপ্তানিযোগ্য মাছ থাকলেও প্রক্রিয়াজাতকরণের প্রযুক্তিগত কোন প্ল্যান্ট না থাকায় রপ্তানি করা সম্ভব হচ্ছেনা। এসব এলাকায় প্রক্রিয়াজাতকরণ প্ল্যান্ট গড়ে উঠরে প্রতি বছর শুটকি মাছের রপ্তানি করে বর্তমানের চেয়ে দ্বিগুন বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করা সম্ভব।

এছাড়া বর্তমানে পোলট্রি শিল্পে শুটকি ব্যবহৃত হচ্ছে ব্যাপক হারে। দেশের পোলট্রি শিল্পের মালিকগন শুটকির গুড়া খাবার হিসেবে ব্যবহার করে থাকেন। সাম্প্রতিককালে পোলট্রি শিল্পের ব্যাপক প্রসার ঘটায় শুটকির চাহিদা বেশ বেড়ে গেছে। দেশে প্রয়োজনীয় পরিমাণে উৎপাদন সম্ভব হচ্ছেনা। ফলে এ শিল্পের মালিকরা বিদেশ থেকেও অনেক সময় খাবার আমদানি করে তাদের চাহিদা পুরণ করছেন। এতে বৈদেশিক মুদ্রার যথেষ্ট অপচয় হচ্ছে।

দেশের উকুলবর্তী জেলেদের মধ্যে সহজ শর্তে ঋণ ও গভীর সমুদ্রে শুটকিযোগ্য মাছ আহরনের জন্য যান্ত্রিক ট্রলার ও নৌকা সরবারহ করে মাছের পরিমাণ বৃদ্ধি করা সম্ভব। এর ফলে একদিকে যেমন পোল্ট্রি ফার্মের জন্য বিদেশ থেকে খাবার আমদানি বন্ধ হবে তেমনি রপ্তানিযোগ্য অতিরিক্ত শুটকি বিদেশে চালান দিয়ে আরো বেশি পরিমাণে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করা সম্ভব।

শুটকি উৎপাদন যাতে হ্রাস না পেয়ে বৃদ্ধি পায়, সে জন্যে দেশের শুটকিযোগ্য মাছের ‍প্রাপ্যতার উপর নির্ভর করে বিভিন্ন স্থানে প্রাকৃতিক উপায়ে শুটকি উৎপাদন নিশ্চিত করার সাথে সাথে জেলেদের প্রয়োজনীয় সুযোগ সুবিধা দেয়া একান্ত পড়েছে।

 

বিশেষ প্রয়োজনেঃ 

আপনার যে কোন সময় এম্বুলেন্স সার্ভিস দরকার হতে পারে। যে কোন ধরনের এম্বুলেন্স সার্ভিস পেতে হলে খালেদ এম্বুলেন্স সার্ভিস এ যোগাযোগ করুন। অথবা কল করুন এখনই ০১৯৩৩২৪৬৫৭৭ – এই নাম্বারটি মনে রাখুন অথবা আপনার মোবাইল এ সেভ করুন এখনই। ইমেইলঃ kmosarrof@gmail.com

আমাদের এম্বুলেন্স সার্ভিস ভিজিট করুনঃ https://khaledrentacar.com/ambulance-service/


Make booking here

Calendar is loading...
Powered by Booking Calendar
Skip to toolbar