দ্বীপের নাম টিয়াবন (Tiyabon Resort)
চালসার কাছে নতুন স্পট মাঙ্গলবাড়ি। সেখানে সবুজ নিরালয় গড়ে উঠেছে টিয়াবন রিসর্ট। শখের বনবাস এবং অজ্ঞাতবাসের আদর্শ ঠিকানা। লিখছেন অরুণাভ দাস
উত্তরবঙ্গের বীস্তীর্ণ সমতল থেকে পাহাড়ে নৈসর্গিক সৌন্দর্যের মায়ায় জড়ানো ডুয়ার্স। সেই সুন্দরের রাজ্যে প্রবেশের চৌরাস্তা চরসা। শিলিগুড়ি থেকে তিস্তা, লিস, ঘিস, চেল ও কুর্তি নদীর অভিবাদন নিতে নিতে সেখানে পৌছনো এক অসাধারণ অভিজ্ঞতা। চালসার খুব কাছে পরমা প্রকৃতির বুকের গহনে ডুয়ার্সের নতুন খুঁজে পাওয়া বিউটি স্পট মঙ্গলবাড়ি। শখের বনবাস ও অজ্ঞাতবাসের আদর্শ ঠিকানা। সেখানে পৌছতে চালসা থেকে গাড়ি ঘুরবে ডানদিকে, গরুমারা জাতীয় উদ্যানের রাস্তায় । তিন কি.মি. গেলেই নিবিড় শালবনের রাজ্যপাট, খাড়িয়ারবান্দর অরণ্য। সেই সবুজ নিরালয়বন –গ্রাম মঙ্গলবাড়িতে সম্প্রতি গড়ে উঠেছে টিয়াবন রিসর্ট। তার একদিকে প্রাচীর হয়ে দাঁড়িয়ে প্রাচীন অরণ্য আর একদিকে বাতাবাড়ি চা বাগান। দূর দিগন্তে হাতছানি দিয়ে ডাকে ভুটানের নীল পাহাড়। নির্গেঘ আকাশের দিনে আকাশের বিশাল ক্যানভাস জুড়ে ঝিলিক দিয়ে যায় স্বর্ণশিখর কাঞ্চনজঙ্ঘার মাথাটুকু। যতক্ষণ দিনের আলো থাকে, ততক্ষণ ঝাঁকে ঝাঁকে টিয়া পাখি উড়ে বেড়ায় গাছ থেকে গাছে। রাত আশেপাশে বেড়াতে বেরয় হাতির পাল । তিন ধনুক হাতে পাহারা দেয় সজাগ শিকারী। এমনই সতত পরিবর্তনশীল রূপের নেশায় মশগুল হয়ে টিয়াবনে অবকাশের দিন কেটে যায় অবলিলায়।
আর পাঁচটা বেড়াবার জায়গার মতো প্রকৃতির উপর প্লাস্টিক সার্জারী করা হয়নি মঙ্গলবাড়িতে। পরিবেশের ভারসাম্য সামান্যতম নষ্ট না করে কী ভাবে আধুনিক ঘরনার পর্যটকবাস সাজিয়ে তোলা যায়, টিয়াবন রিসর্ট (Tiyabon Resort) তার এক উজ্জল উদাহরণ। বড় বাড়ি, বিলাসবহুল ঘরদোরের আরাম সেখানে মিলেবে না। থাকবার ব্যবস্থা দুদিক খোলা বারান্দাওয়ালা ছোট কটেজ এবং কয়েকটা খোলামোলা রঙ্গিন তাঁবুর ভিতর। রান্নাঘর, অফিস- সবই বেড়া দিয়ে তৈরি। থাকা খাওয়ার আটপৌরে আয়োজনের ঘাটতিটুকু পূরণ হয়ে যায় কর্তৃপক্ষ ও কর্মচারীদের উষ্ণ আতিথেয়তায়। চত্বরের ভিতরে এক প্রাচীন শালগাছের গায়ে ঝুলছে অভিনব গাছবাড়ি, উপরে উঠে পাখির চোখে নিসর্গ দর্শনের ব্যবস্থা। গাছবাড়ির নীচে ডালপালা যেখানে আলো-ছায়ার আলপনা এঁকে রেখেছে মখমলি ঘাসজমিতে, সেখানেই রঙবেরঙের বাগান –ছাতার তলায় বন-পাহাড়ের বাহার দেখতে –দেখতে ব্রেকফাস্ট ও লাঞ্চ খাওয়ার আয়োজন। গা ছমছমে রাত্রবেলায় একই জায়গায় পোকা –পতঙ্গের কনসার্টের মাঝখানে জমে উঠতে পারে মুনলাইট পিকনিক আর ক্যাম্প ফায়ার। এখানে খাবার বানানোর কাঁচামাল অর্থাৎ শাক-সবজি সবই চাষ হয় এই রিসর্টের নিজস্ব বাগানে। তার বাকি অংশে চোখচুড়ানো ফুলের বাহার। বসন্তে গেলে বোঝা যাবে, কাকে বলে রঙের দাঙ্গা। সব মিলিয়ে দু একর জায়গা নিয়ে তৈরি টিয়াবন রিসর্ট স্বনির্ভরতার এক সার্থক স্বপ্নচারনা। অপূর্ব, উপভোগ্য । শুধু একানে বসে থেকেই অনায়াসে পার করে দেওয়া যায় তিন চারটে ছুটির দিন। সকাল-বিকেল বনে বনে, চা বাগানে একটু হাঁটা, এটুকুতেই রুটিনে বাঁধা দিনযাপরে গ্লানি, মনের ছেট বড় ক্ষত অনেকখানি মেরামত হয়ে যায়।
তবে আলস্য প্রশ্রয় দিয়ে বসে থাকলে অন্য অনেক প্রাপ্তি অধরা থেকে যাবে। কারণ, মঙ্গলবাড়ি ও চালসার চারদিকে রয়েচে ডুয়ার্সের অসংখ্য বিখ্যাত-অখ্যাত বেড়াবার জায়গা।সবগুলো জায়গা ঘুরে দেখতে হলে সময় লেগে যাবে চার থেকে পাঁচদিন।
রিসর্ট তেকে পায়ে পায়ে পাশের বাতাবাড়ি চা বাগান ছাড়াও বেড়িয়ে আসতে পারবেন জ্যোতি আশ্রম চার্চ। আর একদিকে শালজঙ্গল পার হয়ে কুর্তি চা- বাগান । তার একধার দিয়ে তির তির করে বয়ে গিয়েছে কুর্তি নদী। আশপাশের বাকি জায়গাগুলোতে যেতে হবে গাড়িতে। ব্যবস্থা করে দিবেন রিসর্টের কর্তৃপক্। এখান থেকে সাত-আট কিলোমিটার মধ্যে ’গরুমারা জাতীয় উদ্যান’ এর এক প্রান্তে মূর্তি। রুপসী নদী মূর্তির ওপারে ঘান বন, এপারে ’পশ্চিমবঙ্গ বন উন্নয়ন নিগম’ এর নেচার ইন্টার প্রিটেশন সেন্টার’। মূর্তি বনবাংলোর চত্বরের ভিতরে ঘড়িয়ালের পুকুর দর্শনীয়। সেতুর উপর দিয়ে নদী পার হলেই বন। তার বুক চিরে রাক্সতা গিয়েছে । চোখ যে দিকে চায়, মন যে দিকে যায় , বলে রওনা দিলেই হল। গাড়ি চলেবে সাবধানে, যে কোন সময় পথ আগলে দাড়াতে পারে কোনও বন্যপ্রাণী। একটু গেলে চৌমাথা। সোজা চললে পৌছে যাবেন গন্ডারের বন গরুমারার প্রবেশতোরণ লাটাগুড়িতে।
টিয়াবন রিসর্ট তেকে সোজা রাস্তাও গিয়েছে বিশ- বাইশ কি.মি.দূরের লাটাগুড়ি হয়ে জলপাইগুড়ি সদর। বনের ফতে ডইনে আধ কি.মি. গেলে টন্ডু বিট। দিনের বেলাতেও কেখানকার মাঠে চড়ে বেড়ায় বাইসন। আর বাদিকের রাস্তায় গেলে খুনিয়া মোড়। পথা গিয়েছে চাপড়ামারি অরণ্য ছুঁয়ে পাহাড়শ্রেণী আর জলঢাকা নদীর আঁচলে জড়ানো ঝালং, বিন্দু, রঙ্গো এবং আরও দূরে প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের লীলাভূমি তোদে, তাংদা পর্যন্ত। সেই সব রূপের খনিতে একবার পৌঁছ গেলে মনে মনে প্রতীক্ষা করবেন, কখন আসব ফিরে। টিয়াবন রিসর্টের আরও কাছে এমন আরও অনেক জায়গা আছে যেখানে সুন্দর সহস্রভাবে সংজ্ঞায়িত। ফিকে, গাঢ়, হরেক রঙ্গের তুলি ডুবিয়ে ডুবিয়ে প্রকৃতি যে আত্মভোলা। শিল্পীর মতো নিরন্তর এঁকে চেলেছে সর্বকালের সেরা কোনও চিত্রকর্ম। টিয়াবনের পাঁচ কিলোমিটারের মধ্যে চালসার মাথার উপর আইডিল চা-বাগানের মধ্যে দাড়িয়ে ভাবেন, েএকই হয়তো বলে সঞ্জবনী সৌন্দর্য। এ খনে পাহাড়ের অসংখ্য উচু নিচু ঢাল যে সবুজ সমুদ্র। একই রকম ভাললাগায় আচ্ছন্ন করে চালসা চা-বাগান। তার সীমানা ছাড়িয়ে পোলো গ্রাউন্ড। ব্রিটিশ আমলে বাগিচার কর্তারা উত্তরবঙ্গ ও অসমের নানা দিক থেকে পোলো খেলতে আসতেন। এখনও বছরের নির্দিষ্ট সময়ে গল্ফ খেলার আসর বসে। মখমলের মতে খাসে ঢাকা বিশাল মাঠের একপাশ দিয়ে বয়ে গিয়েছে মূর্তি নদী। দূরে একদিকে দেখা যায় ভুটানের ঝাপসা পাহাড়শ্রেণি, মেঘের মতো স্তরে স্তরে উঠে গিয়েছে আকশে। আর একদিকে একই রকম ঝাপসা পাহাড়। ও দিকেই সামসিং ও সুন্তালেখোলা। পথ গিয়েছে পাহাড়ি গঞ্জ মেটেলি ছুঁয়ে। চালসা থেকে পাঁচ- ছয় কিমির মধ্যে মেটেলি। এক সময় সাবেবদের দারুণ প্রিয় ছিল। তাঁরাই বানিয়েছেলেন দার্জিলিংয়ের মতো ছোট রেলপথ। এখন সে সব স্মৃতি। পখির চোখে চালসা –দর্শন আর চ-বাগানে ঘুরে বেড়ানো, এটাই মেটেলির মুখ্য আকর্ষণ। তার চাদিকে অপূর্ব সুন্দর সব চা-বাগান, জায়গার মতো নামগুলোও মন কাড়ে- জুন্ডি, নাগেশ্বরী,ইঙ্গো আর টিলাউনি। মেটিলি ছাড়িয়ে বার-তের কিমি গেলে সামসিং। ছবির মতো এক পাহাড়ি গ্রাম। কাঠের ঘর-বাড়ি, অর্কিডের বাহার দেখেলে মনে হয় যে উচ্চ হিমালয়ের কোন হিলস্টেশনে এসে পরেছেন। সামসিং থেকে চার কিমি গেলে এ দিককার শেষ জনপদ সুন্তালেখোলা।
পাহাড়ের কোলে বাটির মতো এক ছোট্ট উপতাক্যায় সে যে এক স্বপ্নের ভুবন। এখানে পাহাড়ি ঝোরা সুন্তালেখোলার ধারে পর্যটকদের জন্য টেন্ট ও কটেজ বানিয়ে রেখেছে ’রাজ্য বন উন্নয়ন নিগম’ আশ পাশের পাহাড়ে ঘন অরণ্য, বিচিত্র দর্শন অর্কিডের মেলা। সুন্তালেখোলা থেকে পাহাড় পেরিয়ে অরণ্য মাড়িয়ে দুদিনে ট্রেক করে পৌছে যাওয়া যায় পূর্ব হিমালয়ের নতুন হিলস্টেশন লাভায়। সাধারণ পর্যটকদের জন্য এই রাস্তা বেশ কষ্টকর। তাই চলুন চা-বাগনের গন্ধে গন্ধে অন্য এক রাস্তায় গাড়ি হাকিয়ে পৌঁছে যেতে।
চালসা থেকে চাপড়ামারির রাস্তা ধরে জলঢাকা নদী পেরিয়ে চলুন নাগরাকাটা। তারপর আবার শুরু হয়ে যাবে চা-বাগনের রাজত্ব। নয়া শাইলি বাগানে গাড়ি থেকে নেমে পড়তে ইচ্ছে করে। পথ ক্রমশ শুনশান। পাকা রাস্তার প্রান্তে জিতি চ-বাগান। দূরের পাহাড় একেবারে গায়ের কাছে ঘনিয়ে এসে দাঁড়ায়। ওখানেই নাকি শিবশু ভুটান। কেউ কেউ বলেন ‘গেলো ভুটান’ । শীতকালে কমলালেবুর সাজ পরে মোহময়ী হয়ে ওঠ শিবশু। ও দিকেই নাকি পাহাড়ের পকেটে , অরণ্যের আড়ালে আশ্রয় নিয়েছে ভয়ঙ্কর উগ্রপন্থীর দল। তাই লোক-চলাচলে এখন কিছু কড়াকড়ি চলছে। তবে আপনাদের অবশ্য ভুটান না গেলেও চলবে। বরং গাড়ি নিয়ে গড়গড়িয়ে নে যান জিতি বাগানের শেষ শ্রমিক বস্তিতে। সব বাড়িতে চিলতে বাগান আলো করে রয়েছে খোসায় ঢাকা সুখাদ্য কবি ভুট্টা, পাঁচতারার মাস্ট বেবিকর্ন। কিনতে চাইলে গৃহস্থই লজ্জিত হবে, আদর করে ধরিয়ে দিবে হাতে হাতে। বস্তির ছোট ছোট ছেলেরা পথ দেখিয়ে নিয়ে যাবে রূপসী নদী জিতিখোলার কাছে। একই রেডের ওপর দিয়ে কয়েকশ মিটারের ব্যবধানে পাশাপাশি বয়ে গেছে আরও দুই নদী কালীখোলা এবং শিবশুখোলা। তিনে মিলে জায়গার নাম ত্রিখোলা। বাইরের মানুষের কাছ এ জায়গা চিনিয়েছেন টিয়াবনের প্রাণভজন বান্সফোর। নামকরণই তারই। ত্রিখোলায় নদীর ধারে চড়ুইভাতির কথা বেড়িয়ে ফেরার বহুদিন পরেও থেকে যাবে মনে।
কী ভাবে যাবেন
শিলিগুরির নবনির্মত পি সি মিত্তাল বাসস্ট্যান্ড থেকে মেটেলি, আলিপুরদুয়ার, জয়গাঁ ও জলপাইগুড়ি গামী বাস যায় চালসা। দেড় –দুঘন্টা সময় লাগে। চালসা থেকে মঙ্গলবাড়ির টিয়াবন তিন কিমি। বাস, রিকশা যায়। শিলিগুড়ি থেকে সরাসরি গাড়ি ভাড়া করেও যেতে পারেন।
কোথায় থাকবেন
মঙ্গলবড়িতে একমাত্র থাকার জায়গা ’টিয়াবন রিসর্ট’ কটেজ ভাড়া: দিনপ্রতি পাঁচশত টাকা। ডাবলবেড টেন্ট ভাড়া: দিনপ্রতি তিনশত টাকা।
রিসর্টের প্যাকেজ: তিন রকমের প্যাকেজ রয়েছে রিসর্টের । সবগুলির শুরু ও শেষ শিলিগুড়ি-নিউ জলপাইগুড়ি। লোকাল সাইট সিয়িং সমস্ত রয়েছে প্যাকেজে। দেখানো হয় মূর্তি, পানঝোরা, চালসা পোলো গ্রাউন্ড, সামসিং , দক্ষিণ ধুপঝোড়ার দিগন্তজোড়া লজ্জাবতী লতার মাঠ, আইভিল, কিলকোট, বড়দিঘি ও টন্ডু চা- বাগান।